সম্পাদকীয়

সংবিধান,আইন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর কোস্টগার্ডের প্রশ্নবিদ্ধ হস্তক্ষেপ

  প্রতিনিধি ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ , ৪:২২:০৮ প্রিন্ট সংস্করণ

মাজহারুল ইসলাম।।বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের কালাবদর নদীতে জেলে হাবীব মাঝির মৃত্যুর ঘটনায় প্রকাশিত একটি সংবাদকে কেন্দ্র করে একজন সাংবাদিককে ডেকে নেওয়া,আটকে রাখা,মানসিক চাপ প্রয়োগ এবং সংবাদসূত্র প্রকাশে বাধ্য করার অভিযোগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপের আরেকটি দৃষ্টান্ত।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে মতপ্রকাশ, চিন্তার স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।এই অধিকার কোনো বাহিনীর দয়া বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল নয়।সংবিধান কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এমন ক্ষমতা দেয়নি যে তারা সাংবাদিককে রাস্তায় ধরে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে কিংবা প্রশ্ন তুলবে—কেন বাহিনীর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করা হলো।

আইনের ভাষায় বিষয়টি আরও পরিষ্কার।ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬০ ধারা অনুযায়ী,কাউকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করতে হলে অবশ্যই লিখিত নোটিশ বা সমন দিতে হয়।মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যাওয়া,অস্থায়ী ক্যাম্পে আটকে রাখা কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়ে বক্তব্য আদায় করা আইনত অপহরণ ও বেআইনি আটক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।এটি শুধু সাংবাদিকতার স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়,এটি সরাসরি নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতার লঙ্ঘন।

আরও গুরুতর বিষয় হলো—সংবাদের উৎস জানার জন্য চাপ প্রয়োগ।বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত সাংবাদিকতার নীতিমালায় ‘সোর্স প্রটেকশন’ একটি মৌলিক অধিকার।বাংলাদেশের উচ্চ আদালতও বিভিন্ন রায়ে সাংবাদিকদের তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা রক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।অথচ এখানে সেই অধিকারকে পদদলিত করার চেষ্টা দেখা গেছে।

প্রশ্ন উঠছে—হাবীব মাঝির মৃত্যুর ঘটনায় কেন এখনো কোনো ইউডি (অপমৃত্যু) মামলা হয়নি? একটি মৃত্যুর আইনি প্রক্রিয়া শুরু না করে বরং সংবাদ প্রকাশকারীকে অপরাধী বানানোর চেষ্টা কি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় আচরণ?আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ অপরাধ অনুসন্ধান করা,সংবাদ দমন করা নয়।

সংবাদের সত্যতা বা নৈতিকতা নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে বাংলাদেশের আইন সেই পথও দেখিয়ে দিয়েছে।বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল রয়েছে,আদালত রয়েছে।বাহিনী নিজেই বিচারক হয়ে সাংবাদিককে শাস্তির মুখে ঠেলে দিতে পারে না। এটি আইন নয়,এটি ক্ষমতার দম্ভ।

এই ঘটনা একটি বিপজ্জনক বার্তা দিচ্ছে—যদি আজ একজন সাংবাদিককে এভাবে হয়রানি করা যায়,কাল যে কোনো নাগরিকের কণ্ঠ রোধ করতেও সময় লাগবে না।তাই বিষয়টি কেবল একজন সাংবাদিকের নয়; এটি গণতন্ত্র,আইনের শাসন এবং সংবিধান রক্ষার প্রশ্ন।

আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই—গণমাধ্যমকে ভয় দেখিয়ে নীরব করা যাবে না।সংবিধান কোনো বাহিনীর ঊর্ধ্বে নয়,আর সাংবাদিকতা কোনো অপরাধ নয়।অবিলম্বে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত,দায়ী সদস্যদের জবাবদিহি এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।অন্যথায়,এই নীরবতা রাষ্ট্রকেই একদিন কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।

আরও খবর

Sponsered content