লেখক ও কলামিস্ট এবং মন্তব্য কলাম:-

অবকাঠামো উন্নয়ন,রাজনৈতিক বিতর্ক ও জনজীবন: একটি নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ

  প্রতিনিধি ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ , ১:৩০:৩১ প্রিন্ট সংস্করণ

মাজহারুল ইসলাম।।বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অবকাঠামো উন্নয়ন—ঢাকা শহরের ফ্লাইওভার,মেট্রোরেল,এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে,পদ্মা সেতু,বঙ্গবন্ধু টানেল,পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কিংবা বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল—এসব প্রকল্প শুধু যোগাযোগ ও অর্থনীতির প্রশ্ন নয়; এগুলো রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কেরও কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

একদিকে এসব প্রকল্পের সমর্থকদের যুক্তি,উন্নয়ন মানুষের সময় বাঁচিয়েছে,যাতায়াত সহজ করেছে,বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা এনেছে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়েছে।ঢাকার মতো জনবহুল শহরে মেট্রোরেল ও এক্সপ্রেসওয়ের ফলে দৈনন্দিন জীবনের চাপ কমেছে—এটা অস্বীকার করার সুযোগ কম।

অন্যদিকে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন প্রকল্পগুলোর ব্যয়, স্বচ্ছতা,অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে। তাদের মতে,অবকাঠামো উন্নয়ন যতটা দৃশ্যমান,ততটাই প্রয়োজন ছিল সুশাসন,গণতান্ত্রিক চর্চা ও প্রতিষ্ঠানগত সংস্কার।কেউ কেউ মনে করেন,উন্নয়নকে রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করে ভিন্নমত ও সমালোচনাকে আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো—উন্নয়ন নিজে কোনো অপরাধ নয়,আবার উন্নয়ন থাকলেই সব রাজনৈতিক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না।মানুষের জীবনমান উন্নত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব,কিন্তু একই সঙ্গে নাগরিক অধিকার,মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়িয়েছে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেয়,কক্সবাজার রেলপথ পর্যটন ও আঞ্চলিক অর্থনীতিকে গতি দিয়েছে—এসবই বাস্তব অর্জন।তবে একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় দুর্নীতির অভিযোগ,ব্যয়ের যৌক্তিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের প্রশ্নও জনআলোচনায় এসেছে।

রাজনৈতিক বিতর্কে প্রায়ই দেখা যায়—এক পক্ষ উন্নয়নকে সব কিছুর চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে,আর অন্য পক্ষ উন্নয়নকে তাচ্ছিল্য করে পুরোপুরি অস্বীকার করে। বাস্তবতা সম্ভবত এই দুই অবস্থানের মাঝখানে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য অবকাঠামো অপরিহার্য।কিন্তু সেই উন্নয়ন টেকসই,অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক না হলে তা সমাজে বিভাজন তৈরি করতে পারে।উন্নয়ন মানুষের কষ্ট কমাবে—এটাই স্বাভাবিক ও কাম্য। তবে একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে এমন পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে মানুষ প্রশ্ন করতে পারে,সমালোচনা করতে পারে এবং ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা ব্যক্তি বা সরকারের নয়—প্রশ্নটা রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনের।উন্নয়ন কি শুধু দৃশ্যমান স্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে,নাকি মানুষের অধিকার,মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সঙ্গেও সমানভাবে যুক্ত হবে?

এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের রাজনৈতিক মূল্যায়ন নির্ধারণ করবে।

আরও খবর

Sponsered content