প্রতিনিধি ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ , ১১:৫৫:৪৬ প্রিন্ট সংস্করণ
দ্বৈত নাগরিকত্ব ও ঋণখেলাপি ইস্যুতে ইসির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক।।তিন দফা দাবিতে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘেরাও করেছে বিএনপিপন্থী ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল।রোববার দুপুর থেকে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।
ছাত্রদলের উত্থাপিত তিনটি দাবি হলো—
১) জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আর কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজন না করা
২) দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে বিএনপির যেসব সংসদ সদস্য প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে, তাদের মনোনয়ন পুনর্বহাল
৩) ঋণখেলাপির অভিযোগে যেসব বিএনপি নেতাকর্মীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে,তাদের মনোনয়ন ফিরিয়ে দেওয়া
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নেতারা অভিযোগ করেন,নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা বজায় না রেখে ‘নির্বাচিতভাবে’ বিএনপির প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে।
আইনি ও সাংবিধানিক বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২)(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি ঋণখেলাপি থাকলে তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য হওয়ার অযোগ্য।একইভাবে ৬৬(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশি বা দ্বৈত নাগরিকত্বধারী কেউ বিদেশি নাগরিকত্ব আইনগতভাবে পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না।
হাইকোর্ট বিভাগের রিট পিটিশন নং ১৬৪৬৩/২০২৩ মামলায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—
> “নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করলেই তা কার্যকর হয় না; আবেদন গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিদেশি নাগরিক হিসেবেই বিবেচিত হবেন।”
এই আদেশ বর্তমানে আপিল বিভাগেও বহাল রয়েছে। ফলে আইনগতভাবে নির্বাচন কমিশনের জন্য এসব ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার সুযোগ সীমিত।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে,ছাত্রদলের দাবি রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হলেও আইনের দৃষ্টিতে ইসির পক্ষে এসব মনোনয়ন পুনর্বহাল করা সাংবিধানিক ঝুঁকিপূর্ণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন,ছাত্রদলের এই কর্মসূচি মূলত বিএনপির নির্বাচনী কৌশলের অংশ।দ্বৈত নাগরিকত্ব ও ঋণখেলাপি ইস্যুতে বিএনপির একাধিক প্রার্থী বাদ পড়ায় দলটি সাংগঠনিকভাবে চাপে রয়েছে।
ছাত্রদল মাঠে নামায় বিষয়টি কেবল দলীয় আপত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের রূপ নিচ্ছে,যা নির্বাচন কমিশনের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে।
তবে ক্ষমতাসীন পক্ষের বক্তব্য—আইন সবার জন্য সমান এবং নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ প্রয়োগ করে সিদ্ধান্ত বদলানোর সুযোগ নেই।
সামাজিক প্রেক্ষাপট
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই কর্মসূচি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
একাংশ মনে করছেন,
ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতা বাতিল হওয়া ইতিবাচক নজির
অন্য অংশের দাবি—
আইন প্রয়োগে নির্বাচন কমিশন ‘সমান আচরণ’ করছে না
এর ফলে সাধারণ জনগণের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণ
টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ইসি ঘেরাও কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নির্বাচন ভবন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।এখন পর্যন্ত বড় ধরনের সহিংসতার ঘটনা না ঘটলেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে,
এই কর্মসূচি দীর্ঘস্থায়ী হলে
অন্যান্য ছাত্র ও রাজনৈতিক সংগঠন যুক্ত হলে
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপট
বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট—
১) সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বজায় রাখা
২) রাজনৈতিক চাপ সামাল দেওয়া
৩) নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা
ভবিষ্যতে যদি রাজনৈতিক চাপের মুখে ইসি আইন শিথিল করে,তবে তা আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
অন্যদিকে,দাবিগুলো সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করলে বিএনপি ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোর আন্দোলন আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
উপসংহার
ছাত্রদলের তিন দফা দাবি শুধু একটি সংগঠনের কর্মসূচি নয়, বরং এটি বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে আইনি বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতার সংঘাতের প্রতিচ্ছবি।এই সংঘাত কীভাবে সমাধান হবে—তা নির্ভর করছে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দৃঢ়তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতার ওপর।
















