জাতীয়

৩০.৬% বনাম ১৮.৪%: গণভোট জুড়লে ত্রয়োদশ নির্বাচনে ভোটাধিকার কার্যত ‘অচল’—ইসি ও বিশেষজ্ঞ হিসাবের ভয়াবহ ফারাক

  প্রতিনিধি ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ , ১২:০২:৪০ প্রিন্ট সংস্করণ

৩০.৬% বনাম ১৮.৪%: গণভোট জুড়লে ত্রয়োদশ নির্বাচনে ভোটাধিকার কার্যত ‘অচল’—ইসি ও বিশেষজ্ঞ হিসাবের ভয়াবহ ফারাক

নিজস্ব প্রতিবেদক।।আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণভোট (হ্যাঁ–না ভোট) যুক্ত হলে ভোটাধিকার বাস্তবায়ন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠে এসেছে।নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব হিসাবেই যেখানে সর্বোচ্চ ৩০.৬ শতাংশ ভোট সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে,সেখানে নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের বাস্তবভিত্তিক বিশ্লেষণে সেই হার নেমে আসে মাত্র ১৮.৪ শতাংশে।অর্থাৎ,বর্তমান কেন্দ্র–বুথ ও সময় কাঠামো বহাল থাকলে ৬৯ থেকে ৮২ শতাংশ ভোটার কার্যত ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ হারাতে পারেন—যা একটি সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত বহন করে।

নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী,সারাদেশে ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্রে মোট ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৯টি ভোটকক্ষ (বুথ) নির্ধারণ করা হয়েছে।ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন।ভোটগ্রহণের সময় সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা—মোট ৮ ঘণ্টা বা ৪৮০ মিনিট।

ইসি সংশ্লিষ্টদের অনানুষ্ঠানিক হিসাবে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট মিলিয়ে একজন ভোটারের জন্য গড়ে ৩ মিনিট সময় ধরা হলে,একটি বুথে সর্বোচ্চ ১৬০ জন ভোট দিতে পারবেন। সেই হিসাবে সারাদেশে মোট ভোট পড়তে পারে প্রায় ৩ কোটি ৯১ লাখ,যা মোট ভোটারের মাত্র ৩০.৬ শতাংশ।এই হিসাবও বাস্তবের তুলনায় আশাবাদী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে,নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনায় বিশেষজ্ঞদের মতে,ভোটার শনাক্তকরণ,ব্যালট বোঝা,দুটি ব্যালটে সিল দেওয়া ও বাক্সে ফেলার পুরো প্রক্রিয়ায় গড়ে ৫ মিনিট সময় লাগাই স্বাভাবিক।সেক্ষেত্রে একটি বুথে সর্বোচ্চ ৯৬ জন ভোট দিতে পারবেন।ফলে সারাদেশে ভোট সম্পন্ন হতে পারে প্রায় ২ কোটি ৩৫ লাখ, যা মোট ভোটারের মাত্র ১৮.৪ শতাংশ।

বিশ্লেষকদের মতে,এই চিত্র স্পষ্ট করে দেয়—গণভোট যুক্ত হলে বর্তমান অবকাঠামো ও সময়সীমায় নির্বাচন কার্যত “ভোট সীমাবদ্ধকরণে” পরিণত হবে।বিশেষ করে শহরাঞ্চলে যেখানে একটি কেন্দ্রে গড়ে ৩ হাজার বা তার বেশি ভোটার,সেখানে দীর্ঘ লাইন,সময়স্বল্পতা ও বিশৃঙ্খলা অনিবার্য।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো—দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবার ভোটকেন্দ্র কিছুটা বাড়লেও ভোটকক্ষ কমানো হয়েছে। এতে ভোটগ্রহণের সক্ষমতা বাড়ার বদলে কমে গেছে। নারী ভোটকক্ষ সংখ্যা বেশি দেখানো হলেও বাস্তবে তা ভোটের চাপ কমাতে কতটা কার্যকর হবে,তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন,এ অবস্থায় গণভোট যুক্ত করে নির্বাচন আয়োজন মানে জানার আগেই ফল নির্ধারণের মতো একটি পরিস্থিতি তৈরি করা।ভোট দিতে না পারা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা যদি ভোট দেওয়া জনগোষ্ঠীর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হয়,তাহলে সেই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও বৈধতা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

তাদের মতে,এই সংকট এড়াতে অবিলম্বে—

ভোটগ্রহণের সময় বৃদ্ধি,

উল্লেখযোগ্য হারে বুথ ও ভোটকক্ষ বাড়ানো,

অথবা সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আলাদা দিনে আয়োজন—
এই সিদ্ধান্তগুলোর কোনো একটি না নিলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন গণতান্ত্রিক চর্চার বদলে প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

বর্তমান হিসাব বলছে,প্রশ্ন আর কে জিতবে তা নয়—
প্রশ্ন হলো,কতজন আদৌ ভোট দিতে পারবে?

আরও খবর

Sponsered content