সম্পাদকীয়

সাইবার আইনের নামে সাংবাদিক দমন: রাষ্ট্র কি সংবিধানের বিপক্ষে দাঁড়াবে?

  প্রতিনিধি ১০ জানুয়ারি ২০২৬ , ২:৩৮:৪৬ প্রিন্ট সংস্করণ

মাজহারুল ইসলাম।।একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্য পরিমাপ করা যায় তার সংবাদমাধ্যম কতটা স্বাধীন—এই মৌলিক সত্য বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত।সাইবার আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার কেবল একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি ছিল একটি পরিকল্পিত দমননীতির অংশ,যার লক্ষ্য ছিল সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ,দুর্নীতির আড়াল রক্ষা এবং অপরাধীদের অভয়ারণ্য সৃষ্টি।

আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল নিজেই যখন স্বীকার করেন যে তিনি সাইবার বুলিংয়ের শিকারদের একজন,তখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের আত্মসমালোচনার সময় বহু আগেই পার হয়ে গেছে।আইসিটি আইন বাতিলের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানালেও প্রশ্ন থেকে যায়—আইন বাতিল হলে কী হবে,যদি তার ভূত মাঠপর্যায়ে এখনো সক্রিয় থাকে?

জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা—এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।এটি একটি স্পষ্ট বার্তা: ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও দমনচিন্তার পরিবর্তন হয়নি। এই সংখ্যাটি রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক,এবং গণতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ সতর্ক সংকেত।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কার্যত পরিণত হয়েছিল অপরাধীদের ঢাল হিসেবে।মাদক ব্যবসায়ী,দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক,প্রভাবশালী আমলা ও প্রশাসনের অসাধু সদস্যরা সত্য প্রকাশ ঠেকাতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এই আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে।বরিশাল থেকে খুলনা,পিরোজপুর থেকে রাজধানী—চিত্র এক ও অভিন্ন: সংবাদ প্রকাশ করলেই মামলা,উকিল নোটিশ,হুমকি।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো—যৌন হয়রানি,নারী নির্যাতন, সরকারি দুর্নীতি বা মাদক চক্রের বিরুদ্ধে সংবাদ করাও ‘সাইবার অপরাধে’ রূপান্তরিত হয়েছে।এটি শুধু সাংবাদিকদের নয়,বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত।

সংবিধান সুস্পষ্ট।অনুচ্ছেদ ৩৯ সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে।অনুচ্ছেদ ২৭ আইনের দৃষ্টিতে সমতার কথা বলেছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে—এই অনুচ্ছেদগুলো কাগজে আছে, প্রয়োগে নেই।রাষ্ট্র যখন নিজের সংবিধানকেই পাশ কাটিয়ে চলে,তখন প্রশ্ন ওঠে: আমরা কোন পথে যাচ্ছি?

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ আইসিসিপিআর-এর স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র।অথচ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় আমাদের অবস্থান ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।এতে কেবল সাংবাদিক নয়—রাষ্ট্র নিজেই আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে।

সরকারের কাছে এখন আর আশ্বাস নয়,দৃশ্যমান পদক্ষেপ চাই।সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সব হয়রানিমূলক মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।যারা এই আইনকে ভয়ভীতি ও প্রতিহিংসার হাতিয়ার বানিয়েছে,তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।অন্যথায় ‘আইন সংস্কার’ একটি ফাঁকা রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হবে।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কোনো দয়া নয়—এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ছাড়া দুর্নীতি রোধ অসম্ভব,ন্যায়বিচার কল্পনাপ্রসূত,আর গণতন্ত্র একটি ফাঁপা শব্দ মাত্র।

রাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—সে কি সংবিধানের পক্ষে থাকবে, নাকি ভয় ও নীরবতার রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেবে?

কারণ ইতিহাস ক্ষমা করে না—বিশেষ করে যখন সত্যকে আইনের নামে শাস্তি দেওয়া হয়।

আরও খবর

Sponsered content