সম্পাদকীয়

টঙ্গীর তুরাগে ইজতেমাহীন বছর: নীরবতা কি কেবল আয়োজনের,নাকি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার?

  প্রতিনিধি ৯ জানুয়ারি ২০২৬ , ১:০০:৪৪ প্রিন্ট সংস্করণ

টঙ্গীর তুরাগে ইজতেমাহীন বছর: নীরবতা কি কেবল আয়োজনের,নাকি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার?

মাজহারুল ইসলাম।।টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে বিশ্ব ইজতেমা না হওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়।এটি একটি গভীর সামাজিক,ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় বার্তা বহন করে।প্রায় ছয় দশক ধরে যে সমাবেশ বাংলাদেশের ধর্মীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছিল,তার হঠাৎ অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে—এই নীরবতা কি কেবল একটি আয়োজনের,নাকি রাষ্ট্র পরিচালনার অদৃশ্য দুর্বলতার প্রতিফলন?

১৯৬৭ সালে টঙ্গীতে যাত্রা শুরু করা বিশ্ব ইজতেমা হজের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম সমাবেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।কোনো রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন ছাড়াই,সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে লাখো মানুষের সমাগম—এটি কেবল ধর্মীয় সাফল্য নয়,বরং প্রশাসনিক সক্ষমতারও উদাহরণ ছিল। রাজনৈতিক পালাবদল,জরুরি অবস্থা,সামরিক ও বেসামরিক শাসন—সবকিছু অতিক্রম করেও বিশ্ব ইজতেমা কখনো বন্ধ থাকেনি।

এই বাস্তবতায় এবছর টঙ্গীতে ইজতেমা না হওয়ার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই অস্বস্তিকর।তাবলিগ জামাতের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি একটি বাস্তব সমস্যা—তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো,রাষ্ট্র কি কেবল দর্শকের ভূমিকায় থাকবে? মতভেদ নিরসন,নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ধর্মীয় অধিকার রক্ষার দায়িত্ব কি রাষ্ট্র এড়িয়ে যেতে পারে?

এখানেই তুলনা টেনে আনা হচ্ছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার উদাহরণ।সেখানে ৩৪ বছর পর বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হয়েও যদি দীর্ঘ বিরতির পর এমন আয়োজন সম্ভব করে,তবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে তা অসম্ভব কেন—এই প্রশ্ন উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

আরেকটি অনিবার্য প্রশ্ন উঠে আসে—এটি যদি শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে ঘটত,তাহলে কী প্রতিক্রিয়া হতো?বাস্তবতা হলো,তার সময়ে নানা মতবিরোধ ও সংকট সত্ত্বেও বিশ্ব ইজতেমা কখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এর অর্থ এই নয় যে কোনো শাসন নিখুঁত ছিল; বরং এটিই প্রমাণ করে,রাষ্ট্র চাইলে ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষা করা সম্ভব।

বিশ্ব ইজতেমা কোনো দল বা গোষ্ঠীর একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়। এটি বাংলাদেশের ধর্মীয় ঐতিহ্য,আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং শান্তিপূর্ণ ইসলামের জীবন্ত প্রদর্শনী।আজ যদি তুরাগের তীর নীরব থাকে,তবে সেটি কেবল একটি ধর্মীয় আয়োজনের অনুপস্থিতি নয়—এটি রাষ্ট্র,সমাজ ও নেতৃত্বের জন্য একটি সতর্ক সংকেত।

সম্পাদকীয়র ভাষায় স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন—মতভেদ থাকতে পারে,বিভক্তি থাকতে পারে; কিন্তু ঐতিহ্য ধ্বংসের দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না।টঙ্গীর মাঠ আবার মুখর হবে—এই প্রত্যাশা শুধু ধর্মপ্রাণ মানুষের নয়,বরং বাংলাদেশের সামষ্টিক দায়িত্ব।

আরও খবর

Sponsered content