প্রতিনিধি ১ জানুয়ারি ২০২৬ , ১০:১৭:১৬ প্রিন্ট সংস্করণ
মাজহারুল ইসলাম।।১৫ আগস্ট—জাতির পিতার শাহাদাতের দিন।ইতিহাসের এই শোকাবহ দিনে কেক কেটে উল্লাসের রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ দেখেছে।কিন্তু এর ঠিক পরদিন, ১৬ আগস্ট ২০০১—এই দিনটি শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে অপমানজনক অধ্যায়গুলোর একটি।ওই দিন বিএনপি সরকার আইনের দোহাই দিয়ে শেখ হাসিনাকে গণভবন ছাড়তে বাধ্য করে।প্রশ্ন হলো—আজ এই তারিখের কথা কে স্মরণ করায়?

সরকারি বাড়ি,আইন ও বৈধতার প্রশ্ন
খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে দুটি সরকারি বাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল—
মইনুল হোসেন রোডের বাড়ি (নিজ বসবাসের জন্য)
গুলশানের বাড়ি (ভাড়া দিয়ে আয় করার উদ্দেশ্যে)
এগুলো কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না; ছিল সরকারি অনুগ্রহে প্রাপ্ত বাসভবন।
একইভাবে,মওদুদ আহমেদের বাড়ির ইতিহাস আরও গুরুত্বপূর্ণ।তিনি ১৯৭২ সালে ভাড়াটিয়া হিসেবে ওই বাড়িতে বসবাস শুরু করেন।পরে এরশাদ সরকারের সময়,উপ-রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায়, তিনি সেই বাড়িটি ১০১ টাকার বিনিময়ে লিজ/হস্তান্তর করে নেন—ঠিক খালেদা জিয়ার মতোই। এখানে প্রশ্ন ওঠে: রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে সম্পদ আত্মসাৎ কি আইনের শাসনের মধ্যে পড়ে?
১৯৯৬: আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা
২৩ জুন ১৯৯৬—আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে।একই বছরের মধ্যেই সংসদে পাস হয় জাতির পিতার পরিবারের নিরাপত্তা আইন।
এই আইনের আওতায়—
শেখ হাসিনার জন্য গণভবন
শেখ রেহানার জন্য ধানমন্ডির একটি সরকারি বাসভবন
বরাদ্দ দেওয়া হয়।উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো,তখন ঢাকায় শেখ হাসিনা বা শেখ রেহানার নিজস্ব কোনো ব্যক্তিগত বাড়ি ছিল না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—১৯৯৪ সালে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িটি জাতির জন্য উন্মুক্ত করে দেন। আইনগত অর্থে,সেই বাড়ির মালিকানা তখনই জনগণের হাতে ন্যস্ত হয়।
২০০১: একই আইনে উচ্ছেদ

১ অক্টোবর ২০০১—বিএনপি ক্ষমতায় আসে।
এরপর মাত্র কয়েক মাসের মাথায়,১৬ আগস্ট ২০০১, বিএনপি সরকার জাতির পিতার পরিবারের নিরাপত্তা আইনই প্রয়োগ করে শেখ হাসিনাকে গণভবন ছাড়তে নির্দেশ দেয়।
আইনের দৃষ্টিতে এটি ছিল ‘নোটিশ টু ভ্যাকেট’।শেখ হাসিনা কোনো আইনি প্রতিরোধ গড়ে তোলেননি।তিনি নির্দেশ মেনে গণভবন ত্যাগ করেন।
একই সময়—
শেখ রেহানার ধানমন্ডির বাড়িটি দখলমুক্ত করে সেখানে ধানমন্ডি থানা স্থাপন করা হয়।
শেখ রেহানা আইনি লড়াই শুরু করলেও পরবর্তীতে তা প্রত্যাহার করে রাষ্ট্রের কাছে বাড়িটি হস্তান্তর করেন।
এটাই আইনের প্রতি শ্রদ্ধার বাস্তব দৃষ্টান্ত।
২০০৯–২০১০: আইনের পাল্টা প্রয়োগ
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর—আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে।
এরপর ২০০৯–২০১০ সালে সরকার ঠিক সেই একই আইন ও প্রশাসনিক বিধি প্রয়োগ করে—
খালেদা জিয়াকে
মওদুদ আহমেদকে
সরকারি বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দেয়।
পার্থক্য এখানে স্পষ্ট:
শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা নোটিশ পাওয়ার পর স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়েছিলেন।
খালেদা জিয়া ও মওদুদ আহমেদ আইন অমান্য করেন, বাড়ি দখল করে রাখেন।
ফলে রাষ্ট্র বাধ্য হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে উচ্ছেদ কার্যকর করতে।এটি কোনো প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ নয়—এটি ছিল প্রশাসনিক আইন প্রয়োগ।
আইনের দৃষ্টিতে ভুক্তভোগী কে?
যে ব্যক্তি নিজেই আইন তৈরি ও প্রয়োগ করে অন্যকে উচ্ছেদ করেন,তিনি যখন সেই একই আইন মানতে অস্বীকৃতি জানান—তখন তিনি ভুক্তভোগী নন,বরং আইনভঙ্গকারী দখলদার।
মিডিয়ার সামনে কান্না আইনি বৈধতা সৃষ্টি করে না।আইন বলে—সরকারি সম্পত্তি বেআইনিভাবে দখল করে রাখা ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়তে পারে।
উপসংহার: ইতিহাস কথা বলে
আজ যারা বলেন—“শেখ হাসিনা খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদ করেছেন”—তারা সচেতনভাবে ইতিহাসের অর্ধেক বলছেন।
তারা বলেন না—
১৬ আগস্ট ২০০১ শেখ হাসিনাকে কীভাবে গণভবন ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল;
কোন আইনে শেখ রেহানার বাড়ি থানায় রূপান্তর করা হয়েছিল;
এবং সেই একই আইনে পরে খালেদা জিয়ার উচ্ছেদ কীভাবে সম্পূর্ণ আইনসিদ্ধ হয়েছিল।
এটি প্রতিহিংসা নয়। এটি আইনের ধারাবাহিকতা।
আইনের শাসনে ব্যক্তিত্ব নয়, আবেগ নয়—তারিখ, দলিল ও আচরণই শেষ কথা।
এখানেই খালেদা জিয়ার সৌভাগ্য—তাঁর কৃতকর্ম ইতিহাস আড়াল করে। আর এখানেই শেখ হাসিনার দুর্ভাগ্য—আইন মেনেও তাঁকে প্রতিহিংসাপরায়ণ বলা হয়।


















