প্রতিনিধি ১৭ আগস্ট ২০২৩ , ৩:২৫:৫৬ প্রিন্ট সংস্করণ
মাজহারুল ইসলাম।।ব্রিকস সম্মেলনে যোগদান করতে ২১ আগস্ট দক্ষিণ আফ্রিকা যাচ্ছেন-প্রধানমন্ত্রী,শেখ হাসিনা। আবকিছু ঠিক থাকলে চলতি মাসেই ব্রিকসের সদস্য হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের।কিন্তু সবকিছু যে ঠিক নেই এবং বাংলাদেশের সদস্যপদ পেতে যে এখনও অপেক্ষা করতে হবে; সেই ইঙ্গিতই দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ২১ আগস্ট দক্ষিণ আফ্রিকা যাচ্ছেন ব্রিকস সম্মেলনে যোগদান করতে। চলতি বছরের জুন মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন ব্রাজিল,রাশিয়া,ভারত,চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা যে ব্রিকস ব্যাংক করেছে,সম্প্রতি বাংলাদেশকে সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।সেই সূত্রে ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে সদস্য হয়েছে বাংলাদেশ। আগামীতে ব্রিকসে বাংলাদেশের সদস্য হবার সম্ভাবনা রয়েছে। ব্রিকসে এখন ৫টি সদস্যদেশ রয়েছে।আগামীতে তারা আরও ৮টি দেশকে সদস্য করবে।তার মধ্যে বাংলাদেশ,সৌদি আরব,সংযুক্ত আরব আমিরাত,ইন্দোনেশিয়াকে তারা আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
কিন্তু সম্মেলনে যোগ দেয়ার কয়েকদিন আগেই জানা গেল, আমন্ত্রণ পেলেও আপাতত সদস্য পদ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বাংলাদেশের।মূলত ব্রাজিল এবং ভারত ব্রিকসের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
এর আগে জুন মাসে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বাংলাদেশের ব্রিকসে যোগদানের ব্যাপারে বলেন,জোটের বিস্তারের ব্যাপারে চীন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এক্ষেত্রে সমমনা যেকোনো দেশকে ব্রিকস পরিবারে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত রয়েছে চীন।
উল্লেখ্য,জি-৭ এর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উন্মেষ ঘটেছে ব্রিকসের।যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভয়,জোটের সম্প্রসারণের মধ্যদিয়ে তারা পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাব কমানোর চেষ্টা চালাতে পারে।ব্রাজিল পশ্চিমা বিশ্বের এই অবস্থানকে আমলে নিয়েই তড়িঘড়ি জোটের সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে। আর ভারত চায়,কোনো দেশের জোটভুক্ত হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট নিয়মনীতি থাকা এবং আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই একটি দেশ জোটের সদস্য হোক।এর মধ্যে ভারতের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের অবনতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্কের প্রভাব হিসেবে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে বড় রকমের ইউটার্ন নিয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশটি।
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে কিছুটা উষ্ণতা কমেছিল বৈকি।তবে এটিকে আর নেতিবাচক দিকে প্রবাহিত হতে দিতে নারাজ বাইডেন প্রশাসন।ভারতের ব্যাপারে সুর নরম করে এক রকম আঁতাতের আভাস দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।এই সম্পর্ক বিশ্ব কূটনীতির ইতিহাসে যোগ করেছে ভিন্ন এক মাত্রা।
এর পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন।ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র কারও সঙ্গেই চীনের সম্পর্ক ভালো নয়।একদিকে ভারতের ঘাড়ে যুদ্ধের উষ্ণ নিঃশ্বাস ছাড়ছে চীন,অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সুপার পাওয়ার তকমা কেড়ে নেয়ার দিকে এগুচ্ছে শি জিনপিংয়ের নীতি।
অনেক বিশ্লেষক বলছেন,
ব্রিকস কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতি একটি বড় রকমের মেরুকরণের দিকে যাচ্ছে।বেইজিং-মস্কোর ইচ্ছা তেমনটা থাকলেও ব্রিকস বনাম জি-৭ এর মেরুকরণ প্রতিযোগিতায় নামতে নারাজ দিল্লি।
আটলান্টিক কাউন্সিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী,চলতি বছর আগস্টে চীন-রাশিয়া ব্রিকসের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির পক্ষে থাকলেও, এ পথে হাঁটতে নারাজ ভারত।ভারত চাচ্ছে, ব্রিকসকে একটি আঞ্চলিক সংগঠন হিসেবেই চলমান রাখতে। বিশ্ব রাজনীতিতে সৌদি আরব কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাত অথবা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশকে ব্রিকসে যুক্ত করে আলাদা মাত্রা সৃষ্টির পক্ষপাতী নয় দিল্লি।
তবে এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ভারতকে অনুরোধ করবে কিনা- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘কয়েকদিনের মধ্যে তো ভারত যাচ্ছি।আরও অন্যান্য দেশেও যাচ্ছি,তখন দেখা হবে।দেখা তো হবেই। বিশেষ কোনো আয়োজন আমরা সেখানে করবো,নাকি ভারতে করা হবে, সেটা আমরা চিন্তাভাবনা করছি।’
তবে এ মুহূর্তে ব্রিকসে যোগদান করতে না পারলেও সম্মেলনে যোগদানকে একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ।
এ ব্যাপারে মোমেন বলেন,এটি সবে শুরু। ৭০টি দেশের প্রতিনিধি আসবে ব্রিকস সম্মেলনে।আফ্রিকা মহাদেশের প্রায় সবাই আসবেন।আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে এখনও বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরালো হয়নি।এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করা যাবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ততটা উষ্ণ যাচ্ছে না।দেশটির অযথা নজরদারি ও চাপ প্রয়োগকে ভালোভাবে দেখছে না ঢাকা।আকারে ক্ষুদ্র হলেও ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয়। বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় একেবারে নিরপেক্ষ থাকা যখন দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে,সেখানে বাংলাদেশের ব্রিকসে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছিলেন সংশ্লিষ্টরা।যদিও বাংলাদেশ রাজনৈতিক দিকটিকে সামনে না এনে অর্থনৈতিক দিকেই জোর দিচ্ছে।তবে ব্রিকসে যোগদান দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে অনেকেই মনে করছেন,আন্তর্জাতিক মেরুকরণের খেলায় সরাসরি যুক্ত হতে বাংলাদেশকে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হতে পারে।
ব্রিকসে যোগদানের ব্যাপারে বাংলাদেশের আদর্শিক অবস্থান পরিষ্কার করে চলতি বছরের ২৬ জুন দেয়া এক সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব সাব্বির আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘পররাষ্ট্রনীতি অনুসারে বাংলাদেশ যখন কোনো সংগঠনে যোগ দিতে যায় তখন সবার আগে থাকে অর্থনৈতিক লাভের বিষয়টি।ব্রিকসের ক্ষেত্রেও তাই।বিশ্বে যেভাবে ডলার সংকট দেখা যাচ্ছে,সেখানে ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে নতুন একটি মুদ্রা-ব্যবস্থা চালু করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটি মোটেও সহজ হবে না;তবে দেশগুলোর মধ্যে সাংগঠনিক সম্পর্ক থাকলে অসম্ভব কিছু না।’
তিনি বলেন, ২০২৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বেশ কিছু শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা হারাবে।উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পর সহজে কেউ বাংলাদেশকে এই সুবিধা দিতে চাইবে না। এক্ষেত্রে ব্রিকসে যোগ দিলে কিংবা আলাদা মুদ্রা ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হতে পারলে বাংলাদেশ একটি ভালো অবস্থান নিতে পারবে।

















