লেখক ও কলামিস্ট এবং মন্তব্য কলাম:-

ফুটপাতের পিঠা বিক্রেতা তন্নীকে আয়কর রিটার্নের নোটিশ: আইন কি সবার জন্য সমান,না দুর্বলের জন্য কঠোর?

  প্রতিনিধি ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৩:৪৫:৫৯ প্রিন্ট সংস্করণ

ফুটপাতের পিঠা বিক্রেতা তন্নীকে আয়কর রিটার্নের নোটিশ: আইন কি সবার জন্য সমান,না দুর্বলের জন্য কঠোর?

মাজহারুল ইসলাম।।বরিশাল নগরীর কাশিপুর চৌমাথা এলাকায় ফুটপাতে পিঠা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করা পিঠা বিক্রেতা তন্নীকে আয়কর রিটার্ন দাখিলের নোটিশ দিয়েছে বরিশাল কর অঞ্চল। নোটিশে ২২ দিনের মধ্যে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল না করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

এই ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।প্রশ্ন উঠেছে—ফুটপাতে বসে দৈনিক আয় করা একজন ক্ষুদ্র পিঠা বিক্রেতা কি আদৌ আয়করের আওতায় পড়েন? নাকি এটি প্রশাসনিক অতি-উৎসাহ ও বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্তের আরেকটি উদাহরণ?

আইনি বিশ্লেষণ: আইন আছে,কিন্তু প্রাসঙ্গিকতা কোথায়?

আয়কর আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সীমার বেশি আয় হলে কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবতা হলো—

ক্ষুদ্র ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী

অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী

দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল ফুটপাতের বিক্রেতারা

সাধারণত করযোগ্য ন্যূনতম আয়ের সীমার মধ্যেই পড়েন না। এমনকি তাদের বেশিরভাগেরই স্থায়ী ঠিকানা, ব্যাংক হিসাব বা হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা নেই।

আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে যুক্তিসংগত বাছাই (reasonable classification) একটি মৌলিক নীতি।প্রশ্ন হলো—
👉 বড় করফাঁকিবাজদের ধরতে না পেরে কেন নজর গিয়ে পড়ে একজন পিঠা বিক্রেতার ওপর?
👉 এটি কি আইনের যথাযথ প্রয়োগ,নাকি ক্ষমতাহীন মানুষের ওপর সহজ টার্গেটিং?

আইনের চোখে সবাই সমান—এই নীতি তখনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, যখন আইন প্রয়োগের ভার পড়ে কেবল দুর্বলদের ওপর।

সামাজিক বাস্তবতা: জীবিকার সঙ্গে রাষ্ট্রের সংঘাত

ফুটপাতের পিঠা বিক্রেতা তন্নীর মতো মানুষরা সমাজের প্রান্তিক অংশ।
তাদের ব্যবসা—

টিকে থাকার সংগ্রাম

পরিবারের ন্যূনতম খাবারের নিশ্চয়তা

কর্মসংস্থানের বিকল্পহীন বাস্তবতা

এমন একজন মানুষকে আয়কর নোটিশ দেওয়া মানে কেবল একটি কাগজ পাঠানো নয়; এটি তার মানসিক নিরাপত্তা ও জীবিকার ওপর সরাসরি আঘাত।

এই ঘটনা সমাজে একটি ভয়ংকর বার্তা দেয়—
“আপনি গরিব হলেও রাষ্ট্র আপনাকে ছাড় দেবে না,কিন্তু প্রভাবশালী হলে নিয়ম নমনীয়।”

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: শাসনব্যবস্থার সংবেদনশীলতার সংকট

এই নোটিশ নিছক প্রশাসনিক ভুল হলে দায় রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও এড়ানো যায় না। কারণ—

করনীতিতে রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা জরুরি

কর প্রশাসনকে মানবিক ও বাস্তবতাভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন

যেখানে বড় বড় ব্যবসায়ী,ঋণখেলাপি ও করফাঁকিবাজদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রশ্নবিদ্ধ,সেখানে ফুটপাতের পিঠা বিক্রেতার নামে নোটিশ রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের ভয়ংকর বিভ্রান্তি প্রকাশ করে।

রাজনীতি যদি দুর্বলদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়,তবে প্রশাসন কেবল কাগুজে ক্ষমতার প্রদর্শনীতে ব্যস্ত থাকে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতা: অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর চাপ

বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় অংশ আসে অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে।
এই খাত—

লাখো মানুষের কর্মসংস্থান

দারিদ্র্য বিমোচনের নীরব চালিকা শক্তি

ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর করের ভয় তৈরি করলে—

ব্যবসা সংকুচিত হবে

আয় লুকানোর প্রবণতা বাড়বে

করের আওতা বাড়ার বদলে আস্থা কমবে

অর্থনৈতিকভাবে এটি রাজস্ব বৃদ্ধির কৌশল নয়, বরং আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

উপসংহার: রাষ্ট্র কি শক্তের ওপর নরম, নরমের ওপর শক্ত?

পিঠা বিক্রেতা তন্নীর হাতে কর রিটার্নের নোটিশ রাষ্ট্রের মুখে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে—
আইন কি ন্যায়বিচারের জন্য, নাকি কেবল ক্ষমতা প্রদর্শনের হাতিয়ার?

প্রয়োজন—

কর প্রশাসনের বাস্তবতাভিত্তিক নির্দেশনা

ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক খাতের জন্য স্পষ্ট ছাড় ও নীতিমালা

বড় করফাঁকিবাজদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা

না হলে ফুটপাতের পিঠা বিক্রেতার হাতে আজ যে নোটিশ, কাল তা রাষ্ট্রের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার মৃত্যুসনদ হয়ে দাঁড়াবে।

আরও খবর

Sponsered content