সম্পাদকীয়

কেরানীগঞ্জের মাদরাসায় বোমা বিস্ফোরণ: রাষ্ট্র,আইন ও সমাজের জন্য অশনিসংকেত

  প্রতিনিধি ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৩:৩১:৫৯ প্রিন্ট সংস্করণ

মাজহারুল ইসলাম।।কেরানীগঞ্জের একটি মাদরাসায় বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা,আইনের শাসন এবং সমাজের নৈতিক ভিত্তির ওপর সরাসরি আঘাত।ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো সংবেদনশীল ও পবিত্র স্থানে ককটেল,কেমিক্যাল ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনা আমাদের সামনে এক ভয়ংকর বাস্তবতা উন্মোচন করে দিয়েছে—চরমপন্থা,সন্ত্রাস ও অপরাধী চক্র ক্রমেই ধর্মীয় আড়ালকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে।

এটি শুধু একটি মাদরাসার দেয়াল উড়ে যাওয়ার ঘটনা নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁকফোকর, রাজনৈতিক সদিচ্ছার সংকট এবং সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন।

আইনি বিশ্লেষণ: কঠোর আইন,কিন্তু প্রয়োগ কোথায়?

বাংলাদেশে বিস্ফোরক ও সন্ত্রাস দমনে একাধিক কঠোর আইন বিদ্যমান—

বিস্ফোরক দ্রব্য আইন,১৯০৮

সন্ত্রাসবিরোধী আইন,২০০৯ (সংশোধিত)

দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩২৬, ৪৩৬, ৫১১ ধারা

এই আইন অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া বিস্ফোরক তৈরি,সংরক্ষণ বা ব্যবহার গুরুতর অপরাধ,যার শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।অথচ বাস্তবতা হলো—আইন আছে,প্রয়োগে দুর্বলতা আছে; নজরদারি আছে,কিন্তু কার্যকর গোয়েন্দা তৎপরতার অভাব স্পষ্ট।

প্রশ্ন উঠছে—
👉 কিভাবে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেমিক্যাল ও বিস্ফোরক উপাদান মজুত হয়?
👉 স্থানীয় প্রশাসন,গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী করছিল?

এই ঘটনায় যদি দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হয়,তাহলে আইন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

নিরাপত্তা প্রেক্ষাপট: নীরব বিপদ রাষ্ট্রের ভেতরে

এই বিস্ফোরণ প্রমাণ করে—সন্ত্রাসের হুমকি শেষ হয়নি,বরং নতুন রূপে ফিরে আসছে।ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে উগ্রবাদী কার্যক্রম চালানো হলে তা সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়, কারণ এতে—

সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়

তরুণ শিক্ষার্থীরা চরমপন্থার শিকার হয়

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ভেতর থেকে দুর্বল হয়

এখানে শুধু পুলিশি তদন্ত যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন জাতীয় নিরাপত্তা পুনর্মূল্যায়ন,মাদরাসাসহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছ নিবন্ধন,পাঠ্যক্রম ও আর্থিক উৎসের কঠোর তদারকি।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: দায় এড়ানোর সংস্কৃতি

প্রতিটি বড় নিরাপত্তা ঘটনার পর একটি পরিচিত দৃশ্য দেখা যায়—
ক্ষমতাসীনদের দায় এড়ানো, বিরোধীদের রাজনৈতিক বক্তব্য, আর তদন্তের নামে সময়ক্ষেপণ।

কিন্তু নিরাপত্তা ইস্যু কোনো দলীয় বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র বনাম সন্ত্রাস।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা,নীরব সমর্থন বা “আমাদের লোক” সংস্কৃতি যতদিন থাকবে,ততদিন এমন বিস্ফোরণ থামবে না।

রাজনীতিকদের মনে রাখা দরকার—
আজ দেয়াল উড়েছে,কাল উড়তে পারে মানুষের জীবন, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা।

সামাজিক প্রেক্ষাপট: ধর্মের অপব্যবহার ও নৈতিক অবক্ষয়

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—ধর্মীয় পরিচয়ের অপব্যবহার।
মাদরাসা মানে নৈতিকতা,শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ; সেখানে বোমা তৈরির কারখানা রাষ্ট্র ও সমাজ—উভয়ের জন্য লজ্জাজনক।

এখানে দায় শুধু অপরাধীদের নয়—

যারা চোখ বন্ধ করে থেকেছে

যারা প্রশ্ন তোলেনি

যারা “ধর্মের নামে হলে সব মাফ” সংস্কৃতি চালু করেছে

এই সামাজিক নীরবতাই অপরাধীদের সাহস জোগায়।

অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট: অস্থিতিশীলতার মূল্য জনগণ দেয়

সন্ত্রাস ও বিস্ফোরণের প্রতিটি ঘটনা সরাসরি আঘাত করে—

বিনিয়োগ পরিবেশে

কর্মসংস্থানে

আইনশৃঙ্খলা ব্যয়ে

রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা তখনই বাধাগ্রস্ত হয়,যখন নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
অর্থাৎ, এই বিস্ফোরণের খেসারত শেষ পর্যন্ত দেবে সাধারণ জনগণ।

উপসংহার: এখনই কঠোর পদক্ষেপ নয়,তবে কখন?

কেরানীগঞ্জের ঘটনা রাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—
সময় শেষ,অজুহাত আর চলবে না।

প্রয়োজন—

দৃষ্টান্তমূলক বিচার

মাদরাসাসহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কঠোর নজরদারি

রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও শূন্য সহনশীলতা

ধর্মের নামে অপরাধে জিরো টলারেন্স

না হলে আজ কেরানীগঞ্জ,কাল অন্য কোথাও—দেয়াল নয়, পুরো রাষ্ট্রটাই ঝুঁকিতে পড়বে।

আরও খবর

Sponsered content