প্রতিনিধি ১৫ মে ২০২৪ , ৫:৫৮:১৫ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক।।নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে হাবিবুর রহমান নামে এক কর কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।তিনি ঢাকার কর অঞ্চল-৬ এ হেড অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে কর্মরত।নেত্রকোনার এক এলাকা থেকেই ১০ জনের কাছ থেকে তিনি প্রায় সোয়া ১ কোটি টাকা নিয়েছেন। কিন্তু কারও চাকরি হয়নি।ভুক্তভোগীদের মধ্যে দেলোয়ার হোসেন নামে একজন এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড,প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়,দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে অভিযোগ করেছেন।

ভুক্তভোগী দেলোয়ার হোসেন জানান,২০২০ সালের ৯ জুন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে মেডিক্যাল টেকনিশিয়ান (ইসিজি) পদে ৪১৮ জন নিয়োগের একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ওই বিজ্ঞপ্তির সূত্র ধরে তিনি চাকরির জন্য আবেদন করেন। পরে দূর সম্পর্কের আত্মীয়তার সূত্র ধরে কর কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান তাকে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ১২ লাখ টাকা দাবি করেনসরকারি চাকরি পাওয়ার আসায় তিনি কয়েক কিস্তিতে হাবিবুর রহমানের অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড,সেন্ট্রাল ল কলেজ শাখায় (সঞ্চয়ী হিসাব নম্বর ০২০০০০১০৯০৭১৮) ১২ লাখ টাকা দেন।
দেলোয়ার জানান,তিনি গরিব মানুষ।একটা চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছিলেন।আত্মীয়তার সূত্র ধরে হাবিবুর রহমান তাকে জানান,তিনি তার তিন ভাগনিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চাকরির ব্যবস্থা দিয়েছেন।স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে তার লোক রয়েছে।চাকরির জন্য ১২ লাখ টাকা দিতে হবে।এর পরিপ্রেক্ষিতে দেলোয়ার জমি বন্ধক রেখে ২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর প্রথমে তিন লাখ টাকা হাবিবুরের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দেন।এরপর গরু বিক্রি করে ২২ ডিসেম্বর আরও ২ লাখ টাকা দেন। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ৪ লাখ টাকা,১৭ ফেব্রুয়ারি এক লাখ, ৭ মার্চ ১ লাখ ৫০ হাজার, ্২১ মার্চ ৫০ হাজারসহ মোট ১২ লাখ টাকা দেন। সব টাকাই হাবিবুর রহমানের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে জমা দেন তিনি।
দেলোয়ার আরও জানান,তার বাড়ি নেত্রকোনা সদরের দলপারামপুর এলাকায়।তার এলাকার মোট ১০ জনের কাছ থেকে হাবিবুর রহমান ১ কোটি ২০ লাখ টাকা নিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কারও চাকরিই হয়নি।টাকা চাইতে গেলে কখনও তিনি মেয়েকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাবেন এজন্য দিতে পারবেন না বলে জানান,কখনও কখনও তিনি উল্টো হুমকি ও ভয়ভীতি দেখান।
স্বাস্থ্যের নিয়োগ সিন্ডিকেটেও ছিলেন হাবিবুর!
২০২০ সালে করোনাকালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন পদে একযোগে আড়াই হাজার জনবল নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল।সেই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে পরে নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়। নিয়োগ প্রার্থীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুজনসহ চার জনের বিরুদ্ধে মামলাও করে দুর্নীতি দমন কমিশন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে,স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সেই নিয়োগ সিন্ডিকেটের একজন অন্যতম সদস্য ছিলেন কর কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান।নিয়োগের জন্য প্রার্থী সংগ্রহ করার কাজ ছিল তার।পরে নির্ধারিত তারিখে কেন্দ্রীয়ভাবে অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরীক্ষার পর আলাদা করে তিনি নিয়োগ পরীক্ষা নেন।সেই নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল হাবিবুর রহমানের খিলগাঁওয়ের বাসায়।
ভুক্তভোগী দেলোয়ার জানান,স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত নিয়োগ পরীক্ষার দিনে তারা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন ঠিকই,কিন্তু খাতায় কিছুই লেখেননি।শুধু নাম ও রোল নম্বর লিখে সাদা খাতা জমা দিয়ে আসেন।হাবিবুর তাদের সাদা খাতা জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দিয়েছিলেন।শুধু খাতার শেষের আগের পাতায় একটি কোড লিখে রাখার নির্দেশনা দিয়েছিলেন।দেলোয়ারের কোড ছিল বি-৩৯ নেত্রকোনা।তার নিয়োগ পরীক্ষার কেন্দ্র ছিল খিলগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে।
দেলোয়ার জানান,ওই পরীক্ষার তিন দিন পর তারা খিলগাঁও রেলগেট তিলপাপাড়া জামে মসজিদের পাশে হাবিবুরের বাসায় যান।ওই বাসায় যাওয়ার পর হাবিবুরের কথামতো এক ব্যক্তির কাছ থেকে একটি ব্যাগ নিয়ে আসেন।সেই ব্যাগে তাদের ১০ জনের নিয়োগ পরীক্ষার মূল খাতা ছিল। খাতার পিন খুলে কোড লেখা পাতাটি পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছিল।পরে তারা উত্তর দেখে বাসায় বসে সবগুলো প্রশ্নের উত্তর লেখেন।উত্তর লেখা শেষ হলে হাবিবুর সেই খাতাগুলো নিয়ে খিলগাঁও রেলগেটে গিয়ে এক ব্যক্তির কাছে দিয়ে আসেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান,স্বাস্থ্যের ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ঘুষ দুর্নীতির বিষয়টি উঠে এসেছিল মৌখিক পরীক্ষার সময়।লিখিত পরীক্ষায় যারা প্রায় শতভাগ নম্বর পেয়েছেন,তারা কেউই মৌখিক পরীক্ষায় কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি।এতে নিয়োগ বোর্ডের কারও কারও সন্দেহ হলে সাদা খাতা জমা দেওয়া এবং পরে ভিন্নভাবে নির্দিষ্ট নিয়োগ প্রার্থীদের উত্তর লেখানোর বিষয়টি প্রকাশ হয়।
দেলোয়ারও এই প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করে বলেন, ‘আমাদের পড়াশোনা করতে নিষেধ করেছিলেন হাবিব সাহেব। বলেছে,পড়াশোনা করার দরকার নাই,টাকা দাও,এমনিতেই চাকরি হবে।পরীক্ষার খাতায়ও কিছু লিখতে নিষেধ করেছিলেন।আমি দুয়েকটা প্রশ্নের উত্তর লিখতে পারতাম, কিন্তু হাবিবুর সাহেবের কথামতো কিছুই লিখিনি।’
নিয়োগ বাণিজ্য ও ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদের পাহাড়
সংশ্লিষ্টরা জানান,স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত হাবিবুর কোটি কোটি টাকা আয় করেছেন। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মহিলা পরিদর্শিকা নিয়োগেও তিনি বাণিজ্য করেছেন।টাকার বিনিময়ে তিনি অনেকের চাকরিও দিয়েছেন। কিন্তু যাদের চাকরি হয়নি,তাদের কারও টাকা ফেরতও দেননি।পুরো টাকাটাই নিজে আত্মসাৎ করেছেন।
কর অঞ্চল-৭ এর একজন কর্মকর্তার কাছে হাবিবুর রহমান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন,ওর তো অনেক টাকা। অনেক টাকার মালিক।নামে-বেনামে সম্পদ গড়েছে।স্ত্রীর নামেও সম্পত্তি করেছে।তবে নেত্রকোনার স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, হাবিবুর নিয়োগ বাণিজ্য ও ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অনেক টাকা আয় করেছেন।তবে ক্যাসিনো খেলে অনেক টাকা তিনি নষ্ট করেছেন।বর্তমানে তার মেয়েকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
নিয়োগ বাণিজ্যসহ অন্যান্য বিষয় জানার জন্য হাবিবুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ পাঠানো হলে তিনি ‘সিন’ করলেও কোনও উত্তর দেননি।পরে তার হয়ে ‘এসআই জামান’ পরিচয় দিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অর্থ বিভাগে কর্মরত এক পুলিশ সদস্য এই প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।তিনি এই প্রতিবেদককে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করার কোনও প্রয়োজন নেই বলেও জানান।

















