প্রতিনিধি ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ , ১২:২০:১৩ প্রিন্ট সংস্করণ
মাজহারুল ইসলাম।।ভোটাধিকার কোনো অনুগ্রহ নয়—এটি সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার। অথচ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে যে বাস্তবতা সামনে এসেছে,তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে—এই অধিকার প্রয়োগে ব্যর্থতার দায় সরাসরি নির্বাচন কমিশন ও সরকারের ওপর বর্তায়।

নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সারাদেশে ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্র এবং ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৯টি ভোটকক্ষ নির্ধারণ করা হয়েছে,যেখানে ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন।এই সংখ্যাগুলো কাগজে সুন্দর দেখালেও বাস্তবে এগুলোই ভোটাধিকার সংকোচনের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইসি সংশ্লিষ্টদের আশাবাদী হিসাব অনুযায়ী,সংসদ নির্বাচন ও সম্ভাব্য গণভোট মিলিয়ে গড়ে ৩ মিনিট সময় ধরা হলে সর্বোচ্চ ৩০.৬ শতাংশ ভোট সম্পন্ন করা সম্ভব।অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনাতেই ধরে নেওয়া হচ্ছে—প্রায় ৮ কোটি ৮৫ লাখ মানুষ ভোট দিতে পারবে না।এটিকে কোনোভাবেই দুর্ঘটনা বা অনিচ্ছাকৃত ব্যর্থতা বলা যায় না; এটি একটি সচেতনভাবে গ্রহণ করা কাঠামোর ফল।
আর বিশেষজ্ঞদের বাস্তবভিত্তিক হিসাবে,দুটি ভোট দিতে একজন ভোটারের গড়ে ৫ মিনিট সময় লাগলে ভোট সম্পন্ন হবে মাত্র ১৮.৪ শতাংশ।সেক্ষেত্রে ১০ কোটির বেশি ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকেই বাদ পড়ে যাবেন।এই ভয়াবহ চিত্রের দায় কোনো ভোটারের নয়,কোনো পরিস্থিতিরও নয়—এর দায় সরাসরি পরিকল্পনাকারীদের।
এখানে স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন—ভোট দিতে না পারা যদি সময়স্বল্পতার কারণে ঘটে,তাহলে সেটি ভোটারের ব্যর্থতা নয়; সেটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতা।আর রাষ্ট্রের পক্ষে নির্বাচন আয়োজনের সাংবিধানিক দায়িত্ব যেহেতু নির্বাচন কমিশনের,এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও কাঠামোর দায় যেহেতু সরকারের,তাই ভোটাধিকার বঞ্চনার মূল দায় ইসি ও সরকারের কাঁধেই বর্তায়।
আরও উদ্বেগজনক হলো,দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবার ভোটকেন্দ্র সামান্য বাড়ানো হলেও ভোটকক্ষ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ভোটগ্রহণের সক্ষমতা বাড়ানো হয়নি,বরং পরিকল্পিতভাবে সংকুচিত করা হয়েছে।এটি নিছক অব্যবস্থাপনা নয়—এটি একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত,যার ফল ভোগ করবেন সাধারণ ভোটাররা।
এ অবস্থায় গণভোট যুক্ত করার চিন্তা হলে তা ভোটাধিকার সংকটকে আরও গভীর করবে।অধিকাংশ ভোটার যখন ভোটই দিতে পারবেন না,তখন যে ফলাফল তৈরি হবে,তা আইনগতভাবে ফল হলেও নৈতিক ও গণতান্ত্রিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচন আয়োজন নয়; গণতন্ত্র মানে ১২ কোটি ৭৬ লাখ মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা।যদি নির্বাচন কমিশন ও সরকার এমন একটি কাঠামো দাঁড় করায়,যেখানে ৬৯ থেকে ৮২ শতাংশ মানুষ ভোট দিতে না পারেন,তাহলে সেই নির্বাচন জনগণের নয়—তা প্রশাসনের নির্বাচন।
এখনও সুযোগ আছে ভুল সংশোধনের।ভোটগ্রহণের সময় বাড়ানো,বুথ ও ভোটকক্ষ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি করা,অথবা সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আলাদা দিনে আয়োজন করা—এই সিদ্ধান্তগুলো না নিলে ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে না কে জিতেছিল,প্রশ্ন করবে—কেন কোটি কোটি মানুষকে ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল?
এই প্রশ্নের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
ইসি ও সরকারকেই এর জবাব দিতে হবে।
















