প্রতিনিধি ৫ জানুয়ারি ২০২৬ , ৯:৫৬:৫৭ প্রিন্ট সংস্করণ
গাজীপুর প্রতিনিধি।।গাজীপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একজন কিশোরীকে বয়স জালিয়াতির মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্ক দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা,আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও রাষ্ট্রীয় মানবাধিকার সুরক্ষার ওপর গভীর প্রশ্ন তুলেছে।জন্ম নিবন্ধন অনুযায়ী মোসা: তাহরিমা জান্নাত সুরভী অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও তাকে ২১ বছর বয়সী দেখিয়ে রিমান্ড মঞ্জুরের অভিযোগকে আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা গুরুতর রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা হিসেবে অভিহিত করছেন।

ঘটনার সারসংক্ষেপ
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক ইস্যুকৃত ডিজিটাল জন্ম সনদ অনুযায়ী সুরভীর জন্ম তারিখ ২৯ নভেম্বর ২০০৮। সেই হিসেবে ৫ জানুয়ারি ২০২৬ তার বয়স ১৭ বছর ১ মাস ৭ দিন।অথচ পুলিশের রিমান্ড আবেদনে তাকে ২১ বছর বয়সী দেখানো হয় এবং আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেন।
আইনি বিশ্লেষণ: আইন লঙ্ঘনের একাধিক স্তর
১. শিশু আইন,২০১৩-এর সরাসরি লঙ্ঘন
শিশু আইন,২০১৩ অনুযায়ী—
১৮ বছরের কম বয়সী কাউকে রিমান্ডে নেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
শিশুকে সাধারণ থানা হাজত বা কারাগারে রাখা বেআইনি
শিশুর বিচার কেবলমাত্র শিশু আদালতের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে
এই তিনটি বিধান একযোগে লঙ্ঘিত হওয়ায় এটি কেবল প্রক্রিয়াগত ভুল নয়,বরং আইনের শাসনের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবমাননা।
২. বয়স জালিয়াতি ও মিথ্যা তথ্য প্রদান
পুলিশের রিমান্ড আবেদনে বয়স ২১ বছর উল্লেখ করা হলে তা দণ্ডবিধির অধীনে মিথ্যা তথ্য প্রদান ও নথি বিকৃতি হিসেবে গণ্য হতে পারে।এটি বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
৩. সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার অবমাননা
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে—আসামির বয়স নিয়ে সন্দেহ থাকলে জন্ম সনদ যাচাই বা মেডিকেল বোর্ড গঠন বাধ্যতামূলক।এই নির্দেশনা উপেক্ষা করা আদালত অবমাননার শামিল।
সামাজিক বিশ্লেষণ:শিশুর প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ঠুরতা
একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীকে রিমান্ডে পাঠানো মানে তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঝুঁকিতে ঠেলে দেওয়া। এটি সমাজে একটি ভয়ংকর বার্তা দেয়—
> ‘শিশুর সুরক্ষা নয়,ক্ষমতার অপব্যবহারই প্রাধান্য পায়।’
এই ধরনের ঘটনা সমাজে ভীতি,অনাস্থা এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বিনষ্ট করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: জবাবদিহিহীনতার সংস্কৃতি
রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর নজরদারির অভাবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একটি অংশ দায়মুক্তির সংস্কৃতি উপভোগ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।শিশু আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে ব্যর্থতা রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ঘাটতিরই প্রতিফলন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ: রাষ্ট্রের ওপর ভবিষ্যৎ বোঝা
একটি শিশুর বিরুদ্ধে বেআইনি প্রক্রিয়া—
ভবিষ্যতে ক্ষতিপূরণ মামলা
রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে জরিমানা
আন্তর্জাতিক সহায়তা ও উন্নয়ন প্রকল্পে নেতিবাচক প্রভাব
ডেকে আনতে পারে।এর অর্থনৈতিক দায় শেষ পর্যন্ত বহন করবে জনগণ।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ: বৈশ্বিক অঙ্গীকার লঙ্ঘন
বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (UNCRC)-এর স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র।এই ঘটনায়—
শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ নীতি লঙ্ঘিত
বেআইনি আটক ও বিচার প্রক্রিয়া প্রয়োগ হয়েছে
যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষণ: প্রাতিষ্ঠানিক অবিশ্বাসের ঝুঁকি
আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যখন আইন ভঙ্গ করে, তখন তা দীর্ঘমেয়াদে—
সামাজিক অস্থিরতা
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনাস্থা
চরমপন্থা ও অসন্তোষ
সৃষ্টির ঝুঁকি বাড়ায়, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি।
সামাজিক সুরক্ষা ও মানবাধিকার বিশ্লেষণ
শিশু আইন,সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ (ব্যক্তিগত স্বাধীনতা) এবং মৌলিক মানবাধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন ঘটেছে। এটি রাষ্ট্রের সুরক্ষা প্রদানের সাংবিধানিক দায়ে ব্যর্থতা নির্দেশ করে।
করণীয় ও সুপারিশ
১. অবিলম্বে রিমান্ড আদেশ বাতিল ও সুরভীকে শিশু আদালতের অধীনে স্থানান্তর
৩. সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি তদন্ত
৩. বয়স যাচাই ব্যতীত রিমান্ড আবেদন গ্রহণ না করার বাধ্যতামূলক নির্দেশনা
৪. শিশু আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ
উপসংহার: এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ভুল নয়;এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার গভীর অসংগতির প্রতিচ্ছবি।একজন শিশুকে বেআইনিভাবে রিমান্ডে নেওয়া কেবল একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক সতর্কবার্তা। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এ ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে।












