প্রতিনিধি ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ , ৪:২৯:৪৬ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক।।ক্ষমতার অপব্যবহার করে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ১০ কাঠার প্লট নেওয়ার অভিযোগে দুদকের দায়ের করা মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে গ্রেফতার দেখানো আবেদন মঞ্জুর করেছেন আদালত। শুনানিতে আদালতকে তিনি বলেন,আমাকে যদি বলতো যত কষ্টই হোক,সব টাকা পরিশোধ করতাম।রাজউক কর্তৃপক্ষ ইন্টারেস্টের টাকা মওকুফ করেছে।
বুধবার (১০ সেপ্টেম্বর) ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক ইব্রাহিম মিয়ার আদালতে গ্রেফতার দেখানো শুনানি চলাকালে তিনি এ কথা বলেন।

আজ এবিএম খায়রুল হককে আদালতে আনা হয়।এরপর দুদকের পক্ষে অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান ১০ কাঠার প্লট দুর্নীতির অভিযোগের মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো বিষয়ে শুনানি করেন।এক পর্যায়ে এবিএম খায়রুল হক আদালতে কিছু বলার অনুমতি চান।তখন তাকে সামনে ডেকে নেন বিচারক।
এজলাসের ডায়াসের সামনে এসে তিনি বলেন,সবাই যেভাবে প্লটের জন্য আবেদন করে,আমিও একইভাবে করেছি। এটা আরও ২২ বা ২৩ বছর আগের কথা।কারোরই মনে থাকার কথা না।সে সময় আমি লিখেছিলাম,আমার টাকা নেই।অবসরে যাওয়ার পর টাকা দেবো।টাকা না থাকা তো কোনও অপরাধ না।আমার এতো টাকা ছিল না।সেই কারণে রাজউককে জানিয়ে অবসরে যাওয়ার পরে টাকা দেওয়ার কথা ছিল। অবসরের পর আমি সব টাকা পরিশোধ করেছি। এরপর আমাকে রেজিস্ট্রেশন করে দিয়েছে।বিচারক হিসেবে আমার কাছে টাকা না থাকা সেটা কোনও অপরাধ না।
তিনি আরও বলেন, আমার বয়স ৮১ বছর।দুই সপ্তাহ আগে হার্ট অ্যাটাক হয়।আমি অসুস্থ।এছাড়াও আমি ডজন খানিক রোগে আক্রান্ত।এগুলো বিবেচনা করে যা করার করবেন।
পেশাগত জীবনের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আলোচিতসহ আমি অনেক মামলার জাজমেন্ট দিয়েছি।এগুলো শেষ করতে আমার পৌনে তিন বছর লেগেছে।তখন মাথা তোলার সময় ছিল না।ওই সময়ে বিচার বিভাগের জন্য অনেক কাজ করে দিয়েছি।রানা প্লাজা ভবন ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছিল,সে সময়ে আমিসহ তিন জনকে নিয়ে একটা আন্তর্জাতিক কমিশন গঠন হয়। আমাদের প্রতি মাসে বেতন ছিল সাড়ে ৯ হাজার ডলার। আমরা ১৮ মাস কাজ করেছিলাম।একটা টাকাও নেইনি।কেন নেইনি? চেয়েছিলাম এই দেড় কোটি টাকা রানা প্লাজায় যাদের ক্ষতি হয়েছে তারা যেন পায়।কোথাও কোনোভাবে সুবিধাভোগ করিনি।
এ সময় দুদকের পক্ষের আইনজীবী হাফিজুর রহমান বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন সঠিক তদন্ত ছাড়া কারো বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন না।মামলাটি তদন্তধীন।খায়রুল হককে গ্রেফতার দেখানো হোক।ট্রায়ালে সব তথ্য প্রকাশ পাবে।
এরপর সাবেক এ প্রধান বিচারপতি বলেন, ৪২টি মামলায় রায় দিয়ে আমি অবসরে যাই।তখন থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত আমাকে দুদক কোনও নোটিশ পাঠায়নি।আমি কোটি টাকার মালিক নই।আমার সব টাকা দুদক নিয়ে যেতে পারে।
আসামি পক্ষের আইনজীবী মোনায়েম নবী শাহিন বলেন, খায়রুল হক একজন সৎ জজ।বিচারের কাজ করে সংসার চালাতে তখন তার অনেক কষ্ট হতো।মামলার অভিযোগ অনুযায়ী বকেয়া টাকা পরে পরিশোধ করেছেন।রাজউক সুদের টাকা মওকুফ করলে সেটা তার দোষ হওয়ার কথা নয়।তিনি কখনও মওকুফ চাননি।
এরপর বিচারক বলেন, রাজউক যা টাকা চেয়েছিল তা পরিশোধ করেছিলেন? তখন এ সাবেক বিচারপতি বলেন, আমাকে যদি বলতো যত কষ্টই হোক,সব পরিশোধ করতাম। রাজউক কর্তৃপক্ষ মওকুফ করেছে,সেখানে আমার কোনও দোষ নেই। আমি কখনও মাফ চাইনি।
এদিকে এবিএম খায়রুল হকের জামিন চেয়ে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোনায়েম নবী শাহিন।শুনানিতে তিনি বলেন, আসামি বয়স্ক ব্যক্তি। শারীরিকভাবে গুরুতর অসুস্থ।সার্বিক দিক বিবেচনা করে তার জামিনের প্রার্থনা করছি।
দুদকের পক্ষের আইনজীবী হাফিজুর রহমান জামিনের বিরোধিতা করেন।উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত তাকে গ্রেফতার দেখান।শুনানি শেষে আসামিকে আবার কারাগারে নেওয়া হয়।
গত ৬ আগস্ট দুদকের উপ-পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বাদী হয়ে মামলাটি করেন।এতে খায়রুল হকসহ আট জনকে আসামি করা হয়।এ মামলার অপর আসামিরা হলেন– রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল হুদা, সদস্য (অর্থ ও এস্টেট) আ ই ম গোলাম কিবরিয়া,সদস্য মো. আবু বক্কার সিকদার, সদস্য (পরিকল্পনা) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সিকদার,সদস্য (এস্টেট) আখতার হোসেন ভূঁইয়া, সাবেক যুগ্ম সচিব ও সদস্য (উন্নয়ন) এম মাহবুবুল আলম এবং সদস্য (প্রশাসন ও ভূমি) নাজমুল হাই।
মামলার অভিযোগে বলা হয়,রাজধানীর ২ নম্বর শিক্ষা সম্প্রসারণ সড়কে (নায়েম রোড) পৌনে ১৮ কাঠা জমির ওপর ৬তলা পৈতৃক বাড়ি রয়েছে এবিএম খায়রুল হকের।কিন্তু তিনি দেশের প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে দ্য ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (অ্যালটমেন্ট অব ল্যান্ডস) রুলস, ১৯৬৯ এর বিধি ১৩ লঙ্ঘনের মাধ্যমে হলফনামা দাখিল করে রাজউকের ১০ কাঠা প্লট বাগিয়ে নেন।
আরও বলা হয়,খায়রুল হক প্লট বরাদ্দের শর্ত ভঙ্গ করে নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করেন।রাজউকের কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় সুদ মওকুফের কোনও বিধান না থাকা সত্ত্বেও প্লট বরাদ্দের জন্য সাময়িক বরাদ্দপত্রে শর্ত ভঙ্গ করেন।তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সুদসহ কিস্তির টাকা জমা না দিয়ে অবসরের পর অর্থাৎ বরাদ্দের ৫ বছর পর সুদবিহীনভাবে টাকা জমা দেন।এ ক্ষেত্রে রাজউকের প্রচলিত নীতিমালা ভঙ্গ করে বিশেষ সুবিধা গ্রহণ করে সুদবাবদ ৪ লাখ ৭৪ হাজার ২৪০ টাকা পরিশোধ না করে সরকারের ক্ষতিসাধন ও আত্মসাৎ করে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছে।

















