ব্যবসা ও বাণিজ্য সংবাদ

চুনা পাথরের নামে পাথর আমদানির একটি কারসাজি ধরা পড়েছে!

  প্রতিনিধি ২০ মে ২০২৩ , ১২:৩৭:৩১ প্রিন্ট সংস্করণ

নিজস্ব প্রতিবেদক।।তিন বছর আগেও সিমেন্ট তৈরির অন্যতম উপাদান চুনাপাথরের সিংহভাগই আমদানি করত সিমেন্ট কোম্পানিগুলো।যে পাঁচ উপাদান চূর্ণ করে তৈরি হয় সিমেন্ট, এগুলোর অন্যতম একটি হলো চুনাপাথর।সিমেন্টের এই কাঁচামালের হঠাৎ প্রধান আমদানিকারক হয়ে গেছে রেডিমিক্স কারখানাগুলো।এসব প্রতিষ্ঠান একসময় পাথর আমদানি করত। সে জন্য তারা অস্বাভাবিক পরিমাণে চুনাপাথর আমদানি করায় তাদের নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে তিন বছর পরে এসে চুনাপাথরের নামে পাথর আমদানির একটি কারসাজি ধরা পড়েছে।চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা এলাকার সুপিরিয়র রেডিমিক্স কংক্রিট লিমিটেড চুনাপাথরের নাম দিয়ে এই পাথর এনেছে।

কাস্টমস তথা শুল্ক বিভাগের নথি অনুযায়ী,দুবাইয়ের ফুজাইরা বন্দর থেকে ‘এমভি ডন’ নামের একটি জাহাজে করে গত ২৮ এপ্রিল প্রায় ৫৫ হাজার টনের এই চালান আনা হয়। জাহাজটি পণ্য খালাস শেষে বন্দর ছেড়ে যাওয়ার আগের দিন,অর্থাৎ ৭ মে নমুনা নিয়ে কাস্টমসের পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়।চার দিন পর দেওয়া নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদনে বলা হয়,এই চালানে চুনাপাথর নয়,ধূসর-কালো রঙের চূর্ণ পাথর আনা হয়েছে।প্রতিবেদন পাওয়ার পর শেষ মুহূর্তে তিনটি ছোট জাহাজে থাকা (বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে রাখা হয়) পাথরের একাংশের খালাস স্থগিত করে কাস্টমস।

কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান,পাথরের তুলনায় চুনাপাথরে শুল্কহার ৩০ শতাংশ কম।শুল্ক ফাঁকি দিতেই পাথরের চালানটিকে চুনাপাথর হিসেবে দেখিয়েছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান। ৫৫ হাজার টনের এই চালানে প্রতিষ্ঠানটি শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে ৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।

পরীক্ষায় চুনাপাথরের পরিবর্তে পাথর শনাক্ত হওয়ায় রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি আমদানিকারকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।বড় জাহাজ থেকে স্থানান্তর হওয়া চালানটির একাংশ কাস্টমসের তদারকিতে রয়েছে।

এইচ এম কবির,উপ-কমিশনার,চট্টগ্রাম কাস্টমস
জানতে চাইলে কাস্টমসের উপকমিশনার এইচ এম কবির প্রথম আলোকে বলেন,চালানটি সাময়িক শুল্কায়ন করা হয়েছিল।এখন পরীক্ষায় চুনাপাথরের পরিবর্তে পাথর শনাক্ত হওয়ায় রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি আমদানিকারকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।বড় জাহাজ থেকে স্থানান্তর হওয়া চালানটির একাংশ কাস্টমসের তদারকিতে রয়েছে।

কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে,সুপিরিয়র রেডিমিক্স কারখানা যন্ত্রপাতি আমদানি করে ২০২১ সালের নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে। যন্ত্রপাতি আমদানির এক সপ্তাহের মাথায় ‘চুনাপাথর’-এর প্রথম চালান নিয়ে আসে তারা।২০২২-২৩ অর্থবছরের ১৫ মে (গত সোমবার) পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির নামে ৪ লাখ ৩২ হাজার টন চুনাপাথর আমদানি হয়।তাদের সর্বশেষ চালানের ৫৫ হাজার টনের নমুনা পরীক্ষা করা হলেও অন্য চালান পরীক্ষা ছাড়াই খালাস হয়।

প্রতিষ্ঠানটির সব চালানের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত দেড় বছরে তারা মাত্র একটি চালানে ৫৫ হাজার টন পাথর এনেছে।চালানটি এনেছে যখন চুনাপাথর ও পাথরের শুল্কহার একই ছিল।পাঁচ মাসের মাথায় গত মার্চে চুনাপাথর আমদানিতে ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের পর আবারও তারা চুনাপাথর আমদানির ঘোষণা দিয়ে পাথর আমদানি শুরু করে।

যোগাযোগ করা হলে সুপিরিয়র রেডিমিক্স কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এটা চুনাপাথরই।কাস্টমসের পরীক্ষাগারের প্রতিবেদনে “কালো রঙের গ্রানাইট পাথরের ভাঙা বা চূর্ণ” হিসেবে বলা হয়েছে,যা ঠিক নয়।এ জন্য আমরা বাইরের কোনো পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষার জন্য আবেদন করেছি।বাইরে পরীক্ষা হলে সত্য বেরিয়ে আসবে।’

যেভাবে ফাঁকি দেওয়া হয়;-
গত এক মাসের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়,প্রতি টন পাথরে কাস্টমস বিভাগ শুল্ক-কর আদায় করেছে গড়ে ১ হাজার ৫৪১ টাকা।চুনাপাথরে শুল্ক-কর আদায় করেছে ৬৭৪ টাকা।অর্থাৎ চুনাপাথরের ঘোষণা দিয়ে পাথর আমদানি করে প্রতি টনে ৮৬৭ টাকার শুল্ক-কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।বিভিন্ন রেডিমিক্স কারখানা শুল্ক-কর ফাঁকি দিতে চুনাপাথরের ঘোষণা দিয়ে পাথর আমদানি করে থাকে।রেডিমিক্স কারখানায় সাধারণত পানি,পাথর,বালু ও সিমেন্ট মিশিয়ে রেডিমিক্স কংক্রিট তৈরি করা হয়।

৩ বছরে খালাস ১ কোটি ১৮ লাখ টন;-
কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান,প্রায় তিন বছর আগে থেকে রেডিমিক্স কারখানাগুলোর চুনাপাথর আমদানি বাড়তে থাকে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে রেডিমিক্স কারখানাগুলো চুনাপাথর আমদানি করেছিল প্রায় সাত লাখ টন।তখন রেডিমিক্স কারখানাগুলো মূলত পাথর আমদানি করত।

বিশেষ করে ২০২০-২১ অর্থবছরে রেডিমিক্স কারখানাগুলোর চুনাপাথর আমদানি ২১২ শতাংশ বেড়ে যায়।এতে মোট আমদানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২২ লাখ টন।২০২১-২২ অর্থবছরে ২০৫ শতাংশ বেড়ে আমদানি প্রায় ৬৬ লাখ টনে উন্নীত হয়।২০২২-২৩ অর্থবছরের ১৫ মে পর্যন্ত আমদানি হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ ৬৬ হাজার টন চুনাপাথর।৩ বছরে রেডিমিক্স কারখানাগুলো মোট ১ কোটি ১৮ লাখ টন চুনাপাথর আমদানি করেছে।এটা নিয়ে সন্দেহ কাস্টমসের।

বছর তিনেক আগে পাথর আমদানিতে শীর্ষে ছিল এনডিই রেডিমিক্স কংক্রিট লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠান।এই প্রতিষ্ঠান গত ৩ বছরে প্রায় ৫০ লাখ টন চুনাপাথর আমদানি করে। ২০২১-২২ অর্থবছরে তারা আমদানি করে ২৮ লাখ ১৮ হাজার টন,যা ৩১টি সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মোট আমদানির চেয়ে বেশি।চলতি অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি সাড়ে পাঁচ লাখ টন চুনাপাথর আমদানি করেছে।

আরও খবর

Sponsered content