সম্পাদকীয়

“৭১ বনাম ২৪ নয়—তুলনাবাজ রাজনীতি বন্ধ হোক”

  প্রতিনিধি ৭ জানুয়ারি ২০২৬ , ১:২০:৩১ প্রিন্ট সংস্করণ

“৭১ বনাম ২৪ নয়—তুলনাবাজ রাজনীতি বন্ধ হোক”

মাজহারুল ইসলাম।।যদি কেউ প্রশ্ন তোলে—রবীন্দ্রনাথ বড় না কাজী নজরুল ইসলাম বড়—এই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজের একটি দীর্ঘদিনের বিভ্রান্তি: তুলনার মাধ্যমে মূল্যায়ন।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম—উভয়েই নিজ নিজ দর্শন,সময় ও সামাজিক বাস্তবতায় অনন্য। একজন মানবতাবাদী বিশ্বচিন্তার কবি,অন্যজন শোষণ–নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অগ্নিকবি।কাউকে বড় প্রমাণ করতে গিয়ে কাউকে ছোট করা যেমন অবিবেচনাপ্রসূত, তেমনি ইতিহাসবিরোধীও।

এই বাস্তবতা কেবল সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ নয়; আমাদের রাজনৈতিক ও জাতীয় ইতিহাসেও একইভাবে প্রযোজ্য।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশের ইতিহাস একাধিক সংগ্রামের সমষ্টি। ১৯৫২, ১৯৭১,১৯৯০ এবং ২০২৪—প্রতিটি আন্দোলন ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে জন্ম নিয়েছে।একাত্তর ছিল রাষ্ট্র সৃষ্টির লড়াই, যেখানে উপনিবেশিক ও দমনমূলক শাসনের বিরুদ্ধে অস্তিত্ব রক্ষাই ছিল মুখ্য।আর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল রাষ্ট্রের ভেতরে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ,ফ্যাসিবাদী প্রবণতা ও নাগরিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

এই দুই সময়কে তুলনা করে একটিকে আরেকটির চেয়ে বড় বা ছোট বলার প্রবণতা রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক।কারণ এতে একটি সংগ্রামের বৈধতা অন্য সংগ্রামের বিপরীতে দাঁড় করানো হয়,যা জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করে এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার পথ তৈরি করে।

সামাজিক প্রেক্ষাপট

প্রতিটি আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি আলাদা।ভাষা আন্দোলনে ছিল সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্ন,মুক্তিযুদ্ধে ছিল জাতিসত্তা ও মর্যাদার প্রশ্ন,নব্বইয়ে ছিল স্বৈরতন্ত্রবিরোধী গণঐক্য,আর ২০২৪ সালে ছিল তরুণ সমাজের নেতৃত্বে নাগরিক অধিকার ও ন্যায়বিচারের দাবি।

এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে—বাংলাদেশের সমাজ কখনোই স্থির ছিল না; বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বারবার নিজেকে নতুনভাবে সংগঠিত করেছে।তাই একটি প্রজন্মের আত্মত্যাগকে আরেক প্রজন্মের ত্যাগের বিপরীতে দাঁড় করানো সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং নৈতিকভাবে অন্যায়।

অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট

ইতিহাসের প্রতিটি সংকটের সঙ্গে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সম্পদ বণ্টনের প্রশ্ন গভীরভাবে জড়িত।একাত্তরের আগে ছিল কাঠামোগত শোষণ ও বৈষম্য,নব্বইয়ের আগে ছিল সীমিত অর্থনৈতিক সুযোগ ও দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনব্যবস্থা,আর ২০২৪ সালে এসে অর্থনৈতিক চাপ,কর্মসংস্থানের সংকট,মূল্যস্ফীতি ও সম্পদের কেন্দ্রীভবন জনরোষকে তীব্র করে তোলে।

এই বাস্তবতায় আন্দোলনগুলোকে বিচ্ছিন্ন নয়,বরং অর্থনৈতিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক সংগ্রাম হিসেবেই দেখতে হবে।

নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপট

রাষ্ট্র যখন নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন আন্দোলন অনিবার্য হয়ে ওঠে।বিভিন্ন সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর রাজনৈতিক ব্যবহার,মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচন এবং বিরোধী কণ্ঠ দমনের প্রবণতা রাষ্ট্র–নাগরিক সম্পর্ককে দুর্বল করেছে।

এখানে ১৯৭১ ও ২০২৪-এর তুলনা নয়,বরং শিক্ষা নেওয়াই মুখ্য—কীভাবে রাষ্ট্র যেন আর কখনো নিজের নাগরিকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে না যায়।

আইনি ও সাংবিধানিক প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশের সংবিধান জনগণের সার্বভৌমত্ব,মৌলিক অধিকার ও আইনের শাসনের নিশ্চয়তা দেয়।কিন্তু ইতিহাস বলছে, এসব অধিকার বারবার সীমিত হয়েছে।জরুরি আইন,কালাকানুন,বিচারবহির্ভূত ব্যবস্থা ও দমনমূলক আইন আন্দোলনের পটভূমি তৈরি করেছে।

তাই যে কোনো গণআন্দোলনকে সংবিধানবিরোধী আখ্যা দেওয়ার আগে রাষ্ট্রের নিজস্ব সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের প্রশ্নটি সামনে আনা জরুরি।

উপসংহার

রবীন্দ্রনাথ বনাম নজরুল যেমন একটি বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন, তেমনি ১৯৭১ বনাম ২০২৪-ও একটি ভুল তুলনা।ইতিহাস কোনো প্রতিযোগিতা নয়; ইতিহাস হলো অভিজ্ঞতার ধারাবাহিক পাঠ।

আগামীর সাম্যের বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের স্মরণ রাখতে হবে—১৯৫২-এর ভাষা শহীদগণ,১৯৭১-এর মুক্তিযোদ্ধা শহীদগণ,১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী শহীদগণ এবং ২০২৪-এর ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের শহীদগণ—সবাই একই ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।ইনকিলাব মঞ্চের ওসমান হাদীসহ সকল অজানা–অচেনা দেশপ্রেমিক শহীদ আমাদের জাতিস্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কাউকে বাদ দিয়ে নয়,কাউকে ছোট করে নয়—সবাইকে ধারণ করেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।আমরা তোমাদের ভুলিনি,কখনো ভুলব না—ইনশাআল্লাহ।

আরও খবর

Sponsered content