প্রতিনিধি ৭ জানুয়ারি ২০২৬ , ৫:০৭:১১ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক।।ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক মাস পর ঢাকার আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এই হত্যাকাণ্ডে ১৭ জনকে অভিযুক্ত করা হলেও মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতাদের একটি অংশ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।

ডিবির তদন্তে উঠে এসেছে,হাদি হত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনা হয় সিঙ্গাপুরে বসে।সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়,ওই পরিকল্পনা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক,সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পী।বৈঠকে সরাসরি অংশ নেন শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ।
তদন্ত সংস্থার তথ্যমতে,সিঙ্গাপুরে পাঁচ দিনব্যাপী একাধিক গোপন বৈঠকে হত্যার পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা,অর্থের লেনদেন এবং দায়িত্ব বণ্টন চূড়ান্ত করা হয়।দেশে ফেরার পরপরই ফয়সালের সন্তানের নামে একটি ব্যাংকে ৫৫ লাখ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট (এফডি) খোলার তথ্য পায় তদন্তকারীরা,যা হত্যাকাণ্ডের পারিশ্রমিক ও পরবর্তী নিরাপত্তা ব্যয়ের অংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ডিবির সংবাদ সম্মেলন
চার্জশিট দাখিলের আগে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান,শরিফ ওসমান বিন হাদি ছিলেন সময়ের আলোচিত রাজনৈতিক কণ্ঠ।তিনি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে সভা-সমাবেশ,টেলিভিশন টকশো ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের অতীত সহিংস কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রকাশ্যে কঠোর সমালোচনা করতেন। এতে সংশ্লিষ্ট মহলে ক্ষোভ ও প্রতিশোধপরায়ণতা তৈরি হয়।
ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী,এই ক্ষোভ থেকেই একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক পরিকল্পিতভাবে হাদিকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়।হত্যাকাণ্ডের মূল নির্দেশদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে মিরপুর এলাকার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পীকে।আর সরাসরি গুলিবর্ষণকারী হিসেবে মামলার এক নম্বর আসামি করা হয়েছে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ফয়সাল করিম মাসুদকে।
অভিযুক্ত ১৭ জন
চার্জশিটে অভিযুক্ত ১৭ জন হলেন— ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭),আলমগীর হোসেন (২৬), তাইজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পী (৪৩),ফিলিপ স্নাল (৩২),মুক্তি মাহমুদ (৫১),জেসমিন আক্তার (৪২),মো. হুমায়ূন কবির (৭০),হাসি বেগম (৬০),সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪),ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭),মারিয়া আক্তার লিমা (২১),মো. কবির (৩৩),মো. নুরুজ্জামান ওরফে উজ্জ্বল (৩৪),সিবিয়ন দিও (৩২),সঞ্জয় চিসিম (২৩), মো. আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭) এবং মো. ফয়সাল (২৫)।
এর মধ্যে ফয়সাল করিম মাসুদ,আলমগীর হোসেন,তাইজুল ইসলাম বাপ্পী,জেসমিন আক্তার ও মুক্তি মাহমুদ এখনো পলাতক রয়েছে।এ পর্যন্ত মামলায় ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
হত্যার ঘটনা
১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে রিকশায় থাকা অবস্থায় শরিফ ওসমান বিন হাদির মাথায় গুলি করা হয়।মোটরসাইকেলে থাকা হামলাকারীরা মুহূর্তের মধ্যেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে ১৮ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।এ ঘটনায় ১৪ ডিসেম্বর পল্টন থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।
পালিয়ে যাওয়া ও তদন্ত
ডিবির তথ্যমতে,হত্যাকাণ্ডের পরপরই ফয়সাল ও আলমগীরকে দেশত্যাগে সহায়তা করেন বাপ্পীর ভগিনীপতি আমিনুল ইসলাম। তার সরাসরি নির্দেশনায় দালাল ফিলিপ স্নালের মাধ্যমে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত ব্যবহার করে তারা ভারতে পালিয়ে যান।বর্তমানে আমিনুল ইসলাম গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন।
ডিবি জানায়,হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রের ব্যালিস্টিক পরীক্ষার প্রতিবেদন ইতিবাচক এসেছে।পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষীর বক্তব্য এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ফরেনসিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে অভিযোগপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন,নতুন তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে মামলায় সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।এই হত্যাকাণ্ড দেশের রাজনীতিতে ভিন্নমতের নিরাপত্তা,নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রভাব এবং পলাতক অপরাধীদের আশ্রয়ের প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছে।
















