সম্পাদকীয়

শেখ হাসিনা—ইতিহাস,নেতৃত্ব ও বিতর্কের ঊর্ধ্বে এক অধ্যায়

  প্রতিনিধি ৭ জানুয়ারি ২০২৬ , ১:০৬:১৪ প্রিন্ট সংস্করণ

শেখ হাসিনা—ইতিহাস,নেতৃত্ব ও বিতর্কের ঊর্ধ্বে এক অধ্যায়

মাজহারুল ইসলাম।।বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা এক ব্যতিক্রমী নাম।সমালোচনা–প্রশংসার তীব্র দ্বন্দ্বের মাঝেও তিনি এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা,যাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।দীর্ঘ প্রায় ২১ বছর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন, প্রায় চার দশকের রাজপথের সংগ্রাম এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্বীকৃতি—সব মিলিয়ে শেখ হাসিনা কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতা নন,তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি পূর্ণাঙ্গ অধ্যায়।

বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে নারীনেতৃত্বের যে অল্প কয়েকটি দৃষ্টান্ত বারবার আলোচিত হয়,শেখ হাসিনা তাদের অন্যতম। Time Magazine, Foreign Affairs, Arab News কিংবা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপে তাঁর নাম উঠে আসা কাকতালীয় নয়।বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকটে মানবিক অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যে প্রশংসা তিনি পেয়েছেন,তা বাংলাদেশকে একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করেছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় মানবিকতা ও বাস্তবতার এই সমন্বয়ই শেখ হাসিনার নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

তবে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক গুরুত্ব কেবল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়।স্বাধীনতার পরবর্তী বাংলাদেশে যে তিনটি সামরিক শাসন দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে—জিয়া,এরশাদ ও মঈন ইউ আহমেদের শাসন—তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রতিরোধের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা ছিলেন দৃঢ় অবস্থানে।নির্বাসন,রাজনৈতিক সহিংসতা,একাধিকবার প্রাণনাশের চেষ্টা—সবকিছু সত্ত্বেও তিনি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াননি।এই ধারাবাহিকতা তাঁকে অনেক সমসাময়িক নেতার চেয়ে আলাদা করেছে।

রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর সবচেয়ে আলোচিত অর্জনগুলোর একটি ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি।দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে এই চুক্তি প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে জটিল সমস্যারও শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব।একইভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করা ছিল এক সাহসী ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত,যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

সমালোচকরা শেখ হাসিনার শাসনামলে গণতন্ত্র,মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন—এ প্রশ্নগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রনায়কের মূল্যায়ন হতে হবে তাঁর অর্জনের পাশাপাশি এসব বিতর্কের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের মাধ্যমেই।কিন্তু সমালোচনা করতে গিয়ে তাঁর অবদান অস্বীকার করাও ইতিহাসের প্রতি অবিচার হবে।

আজ বাস্তবতা হলো—শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছেন,যেখানে তাঁকে কেবল ক্ষমতাসীন নেতা হিসেবে নয়,রাষ্ট্র গঠনের এক দীর্ঘ ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার প্রধান চরিত্র হিসেবে দেখতে হয়।ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁর শাসনামলকে বিচার করবে সাফল্য,ব্যর্থতা ও বিতর্ক—এই তিনের সমন্বয়ে।কিন্তু এটুকু নিশ্চিতভাবেই বলা যায়,শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়।

ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিকে নয়,সময়কে বিচার করে।সেই বিচারের কাঠগড়ায় শেখ হাসিনা থাকবেন—একজন শক্তিশালী, বিতর্কিত,কিন্তু অনস্বীকার্য রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে।

আরও খবর

Sponsered content