প্রতিনিধি ২০ জানুয়ারি ২০২৬ , ৩:১০:১৮ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক।।বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন সম্প্রতি নেত্রকোণায় এক মতবিনিময় সভায় মন্তব্য করেছেন,“পদ্মা সেতুর ঋণ ও দায় পরিশোধ করতে গিয়ে দেশে চালের দাম কেজিপ্রতি প্রায় ২০ টাকা বেড়েছে।” তাঁর এই বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—এই দাবি কতটা বাস্তবসম্মত,নাকি এটি একটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকটকে বোঝাতে দেওয়া প্রতীকী বক্তব্য?

উক্তির মূল বক্তব্য কী বলছে
উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন,পদ্মা সেতুর মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয়ের কারণে সরকার কৃষি, সেচ ও খাদ্য উৎপাদন খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে পারেনি। তাঁর মতে,যদি ওই অর্থ সেচ ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে ব্যয় হতো,তবে চালের দাম কেজিপ্রতি অন্তত আরও ৫ টাকা কম রাখা সম্ভব হতো।তিনি আরও অভিযোগ করেন,বিগত সরকারের “উচ্চাভিলাষী ও অপ্রয়োজনীয়” প্রকল্পগুলোর ঋণের বোঝাই বর্তমান বাজার সংকটের অন্যতম কারণ।
চালের বাজারের বাস্তব চিত্র
পরিসংখ্যান বলছে,২০২৫ সালের শুরু থেকেই বাজারে সরু চাল—বিশেষ করে মিনিকেট ও নাজিরশাইল—এর দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে।
২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে নাজিরশাইল চালের দাম ছিল কেজিতে ৭৫–৭৬ টাকা
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সেই দাম ওঠানামা করছে প্রায় ৭০–৮৫ টাকার মধ্যে
মোটা চালের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে—৪৩–৫০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৫৪–৬০ টাকা।
অর্থাৎ চালের দাম বেড়েছে ঠিকই,তবে সেটি সরাসরি ২০ টাকা এক লাফে নয়; বরং কয়েক বছরে ধাপে ধাপে।
মূল্যস্ফীতি ও ডলারের চাপ
অর্থনীতিবিদদের মতে,চালের দাম বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণ তিনটি—
১. উচ্চ মূল্যস্ফীতি: ২০২৪ সালের শেষ দিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছায়।২০২৬ সালের শুরুতে তা কমে এলেও বাজারে এর প্রভাব রয়ে গেছে।
২. ডলারের সংকট: ডলারের দাম ১২২–১২৯ টাকায় ওঠায় চালসহ সব আমদানিপণ্যের খরচ বেড়েছে।
৩. আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ সরবরাহ: বিশ্ববাজারে চালের দাম কিছুটা কমলেও পরিবহন ব্যয়, ডলার সংকট ও মজুতদারির কারণে দেশে তার সুফল পুরোপুরি আসেনি।
পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক প্রভাব
পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যয় প্রথমে ধরা হয়েছিল প্রায় ১.৪৮ বিলিয়ন ডলার,যা শেষ পর্যন্ত বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩.৫৬ বিলিয়ন ডলারে।এই অতিরিক্ত ব্যয় সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে বড় অঙ্কের অর্থ জোগাড় করতে বাধ্য করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে,এই দায় সরাসরি চালের দামে “২০ টাকা যোগ” করেনি, তবে—
সরকারি ব্যয়ের চাপ বেড়েছে
ভর্তুকি ও কৃষি সহায়তায় সীমাবদ্ধতা এসেছে
ডলার রিজার্ভে চাপ পড়ে আমদানির খরচ বেড়েছে
এই সবকিছু মিলেই চালসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার একটি পরোক্ষ পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
সরকারের পাল্টা উদ্যোগ
চালের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার ইতোমধ্যে আমদানিশুল্ক ৬৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশে এনেছে।ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে চাল আমদানি করা হচ্ছে এবং সরকারি গুদামে ১২ লাখ টনের বেশি খাদ্য মজুত রয়েছে।পাশাপাশি টিসিবির মাধ্যমে এক কোটি পরিবারকে কেজিপ্রতি ৩০ টাকা দরে চাল সরবরাহ করা হচ্ছে।
বিশ্লেষণ: ২০ টাকা কি বাস্তব নাকি প্রতীকী?
অর্থনীতিবিদদের বড় অংশের মত হলো—পদ্মা সেতু এককভাবে চালের দাম ২০ টাকা বাড়িয়েছে বলা অর্থনৈতিকভাবে অতিরঞ্জিত।তবে এটি একটি প্রতীকী বক্তব্য,যার মাধ্যমে বড় প্রকল্পের দায়,ডলার সংকট,মূল্যস্ফীতি ও নীতিগত দুর্বলতার সম্মিলিত প্রভাব বোঝানো হয়েছে।
উপসংহার
পদ্মা সেতু নিঃসন্দেহে দেশের জন্য একটি কৌশলগত অবকাঠামো।কিন্তু এর অর্থনৈতিক দায়ের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পড়েছে—এ কথাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।চালের দাম বৃদ্ধির পেছনে পদ্মা সেতু একটি পরোক্ষ কারণ,তবে মূল চালিকাশক্তি হলো দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি,ডলার সংকট এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা।
অতএব,“পদ্মা সেতুর কারণে চাল ২০ টাকা বেড়েছে”—এই বক্তব্যকে সরল গাণিতিক সত্য নয়,বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।











