প্রতিনিধি ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ , ১:৪৩:২৫ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক।।দেশের সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল,নদীপথ ও সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন আধাসামরিক বাহিনী বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড দীর্ঘদিন ধরে “Guardian at Sea” বা সমুদ্রের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছে।আইনশৃঙ্খলা রক্ষা,চোরাচালান প্রতিরোধ,অনুসন্ধান ও উদ্ধার (SAR),প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহায়তা,পরিবেশ ও সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং বন্দর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এসবই তাদের স্বীকৃত ও আইনসম্মত দায়িত্ব।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভোলা–বরিশাল অঞ্চলে নির্বাচনী প্রটেকশন প্রেট্রোল ডিউটির আওতায় কোস্ট গার্ডের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।স্থানীয়দের অভিযোগ,ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি ছাড়াই স্থলপথে শহর ও গ্রামে অভিযান পরিচালনা করে নিরীহ মানুষকে আটক,জিজ্ঞাসাবাদ ও হয়রানি করা হচ্ছে,যা তাদের নির্ধারিত দায়িত্বের পরিধির বাইরে।
আইনি অবস্থান কী বলে?
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন,নির্বাচনী প্রটেকশন প্রেট্রোল ডিউটিতে নিয়োজিত কোস্ট গার্ডের ক্ষমতা সীমিত ও নির্দিষ্ট।
ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ বা উপস্থিতি ব্যতীত নাগরিক আটক বা তল্লাশি চালানোর এখতিয়ার নেই।
ফৌজদারি মামলার বাদী হওয়া বা নিজ উদ্যোগে মামলা দায়ের করা আইনসিদ্ধ নয়।
স্থলভাগে সাধারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব মূলত পুলিশ ও প্রশাসনের।
সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনবিদের ভাষায়,> “কোস্ট গার্ড যদি নিজ দায়িত্বসীমা অতিক্রম করে স্থলভাগে অভিযান চালায়, তাহলে তা ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এটি সংবিধানের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।”
সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ
বাংলাদেশের সংবিধানের:
অনুচ্ছেদ ৩১: আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার
অনুচ্ছেদ ৩২: ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা
এই দুই অনুচ্ছেদের আলোকে,বিনা কারণে আটক,ভয়ভীতি প্রদর্শন বা হয়রানি স্পষ্টভাবে অসাংবিধানিক।নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল সময়ে কোনো বাহিনীর এমন আচরণ নাগরিক অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জনআস্থা
কোস্ট গার্ড একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী,যার প্রতি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের আস্থা রয়েছে—বিশেষ করে দুর্যোগ ও উদ্ধারকালে।কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী,যদি সেই বাহিনীই নিরীহ মানুষের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়,তাহলে—জনআস্থা ক্ষুণ্ন হয়।
নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি ভীতি তৈরি হয়।রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক দুর্বল হয়।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন,“নিরাপত্তা দিতে এসে যদি মানুষকেই ভয় দেখানো হয়,তাহলে আমরা কার কাছে যাব?”
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: নির্বাচন ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নে
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,নির্বাচনের আগে কোনো বাহিনীর পক্ষপাতমূলক আচরণ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা ও অভিযান চালানোর অভিযোগ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন—
১.নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা হতে হবে নিরপেক্ষ ও সীমাবদ্ধ। ২.ক্ষমতার অপব্যবহার রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে। ৩.বিরোধী মত বা সাধারণ জনগণকে চাপে রাখার অভিযোগ নির্বাচনকে বিতর্কিত করতে পারে।
দায় কার,সমাধান কোথায়?
বিশ্লেষকদের মতে,এখনই প্রয়োজন—কোস্ট গার্ডের দায়িত্বসীমা স্পষ্ট করে নির্দেশনা।অভিযানের ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট ও প্রশাসনের বাধ্যতামূলক তদারকি।অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত।
হয়রানির শিকার ব্যক্তিদের আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করা
না হলে, “সমুদ্রের অভিভাবক” হিসেবে পরিচিত বাহিনী নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া এই প্রশ্ন ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের জন্ম দিতে পারে।
















