সারাদেশ

আমার আশা প্রধানমন্ত্রী আমার স্ত্রীকে ভবিষ্যতে একটি সরকারি চাকরি দেবেন-রিক্সাচালক,ফেরদৌস মন্ডল

  প্রতিনিধি ১৯ জানুয়ারি ২০২৪ , ৩:০২:৩৪ প্রিন্ট সংস্করণ

বগুড়া জেলা প্রতিনিধি।।প্রধানমন্ত্রীর কাছে থেকে চাকরি পাওয়া সীমানুর খাতুনকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত তার পরিবারের সদস্যরা।স্ত্রীকে সুশিক্ষিত করার সংকল্পে সফল হয়ে গর্বিত স্বামী ফেরদৌস মণ্ডলও।

গত ১৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে বগুড়ার জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বগুড়া কালেক্টরেট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রাথমিক শাখায় সহকারী শিক্ষকের নিয়োগপত্র তুলে দেন সীমানুর খাতুনের হাতে।

বৃহস্পতিবার (১৯ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় বগুড়ার গাবতলীর নশিপুর গ্রামের বাড়িতে কথা হয় ফেরদৌস-সীমানুর দম্পতির সঙ্গে।

জানা যায়,বগুড়ার গাবতলী উপজেলার নশিপুর ঠিকাদার পাড়ার ফেরদৌস মণ্ডলের পড়াশোনার ইচ্ছে থাকলেও পারিবারিক কারণে কিশোর বয়সেই সংসারের হাল ধরতে হয়।প্রাথমিক স্কুল পেরিয়ে যাওয়ার পর অভাবের কারণে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়।একপর্যায়ে ২০১০ সালে বগুড়ার ধুনট উপজেলার নাংলু গ্রামের সীমানুর খাতুনকে বিয়ে করেন ফেরদৌস মণ্ডল।তখন স্ত্রী সীমানুর এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। ভর্তি হবেন একাদশ শ্রেণিতে।নিজে পড়াশোনা করতে না পেরে স্ত্রীকে পড়াশোনা করান।

ধুনট কলেজ থেকে বিএ পাসের পর মাস্টার্স সম্পন্ন করতে ভর্তি হন বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী সরকারি আজিজুল হক কলেজে। ২০২৩ সালে এই কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে মাস্টার্স পাস করে উচ্চশিক্ষার আশা পূরণ করেন সীমানুর।রিকশা চালিয়েই স্ত্রীর ভরণপোষণ ও পড়াশোনা চালিয়ে যান।স্বামীর রিকশা করেই যাতায়াত করতেন কলেজে। সংসারের বাড়তি আয় করতে গৃহবধূ সীমানুর পড়ালেখার ফাঁকে দর্জির কাজও করেছেন।

সীমানুর-ফেরদৌসের সংসারে এক মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে।আর ছেলের বয়স তিন বছর

অবশেষে স্বামী-স্ত্রীর সংগ্রামের এমন স্বীকৃতিতে আত্মীয়-স্বজন,প্রতিবেশীরা গর্বিত।সরকারের পক্ষ থেকে এই সহযোগিতার জন্য তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন

সীমানুরের চাচিশাশুড়ি মোছা. মরিয়ম খাতুন বলেন, সীমানুর অনেক কষ্ট করে সংসারের পরিচালনা করার পাশাপাশি পড়াশোনা করেছে।তার এমন প্রাপ্তিতে আমরা খুব আনন্দিত

সীমানুরের স্বামীর বড় ভাই লতিফ মণ্ডল বলেন,আমার ভাই অনেক কষ্টে সংসার চালিয়েছে।রিকশা চালিয়ে দিনে ৩০০-৪০০ টাকা আয় করত।সেই টাকা দিয়ে স্ত্রীর পড়ার খরচ,সংসারের খরচ মিটাতো।এখন তার চাকরি শুধু আমাদের না,পুরো গাবতলীর মানুষের গর্বের বিষয়।

সীমানুরের স্বামী ফেরদৌস মণ্ডল  বলেন,ইচ্ছা ছিল এসএসসি পাস করে পুলিশ হওয়ার।কিন্তু আমার বাবা খুব গরিব মানুষ ছিলেন।বাউল শিল্পী ছিলেন,গান-বাজনা নিয়ে থাকতেন।সে সময় খুব কষ্টে আমাদের দিন গেছে।এ জন্য আমার পড়াশোনা আর হয়নি। রোজগারের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য করেছি।পরে ২০১০ সালে ১৮ ডিসেম্বর সীমানুরকে বিয়ে করি।তখন আমার মনে হয়েছিল আমি যদি আমার স্ত্রীকে শিক্ষিত করতে পারি তাহলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাকে একটা চাকরি দেবেন।এই আশা ব্যক্ত রেখে তাকে সরকারি আজিজুল হক কলেজে মাস্টার্সে ভর্তি করাই।

স্ত্রী চাকরি পাওয়াতে সবচেয়ে খুশি স্বামী ফেরদৌস মণ্ডল।তিনি আরও বলেন,আমার মতো মানুষের স্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রী চাকরি দিয়েছেন এটা অনেক বড় পাওয়া। এখন আমার স্ত্রী মাসে ১০ হাজার টাকা করে পাবে। তবে স্ত্রীকে একটা সরকারি চাকরি দিলে আমাকে আর রিকশা চালিয়ে খেতে হতো না।আমার আশা প্রধানমন্ত্রী আমার স্ত্রীকে ভবিষ্যতে একটি সরকারি চাকরি দেবেন, তাহলে আমরা আরও ভালোভাবে চলতে পারব।

সীমানুর খাতুন বলেন,আমার স্বামীর প্রচণ্ড ইচ্ছা ছিল পড়াশোনা করার।কিন্তু আর্থিক অবস্থার কারণে সেটা করতে পারেননি।এ জন্য আমাকে পড়িয়েছেন।আমি প্রাথমিকে শিক্ষক নিবন্ধনে আবেদন করে রেখেছি। তারপর তো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ডিসি স্যারের মাধ্যমে চাকরির ব্যবস্থা করে দিলেন।চাকরি পেয়ে স্বামীর মনোভাব অনেক ভালো।আমার স্বামীর জন্য আরও ভালো হত যদি আমার একটা সরকারি চাকরি হত। তাহলে তাকে আর এত কষ্ট করা লাগত না।

বগুড়া কালেক্টরেট পাবলিক স্কুল ও কলেজের প্রধান শিক্ষক মো. আল মামুন সরদার  বলেন,সীমানুর খাতুনকে আমাদের এখানে প্রাথমিক শাখায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।এই নিয়োগটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনায় এবং বগুড়ার মান্যবর জেলা প্রশাসকের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন,১৫ জানুয়ারি সীমানুর খাতুনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।তবে তিনি একটি এনজিওতে ছোট বাচ্চাদের পড়ান।সেখানকার আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি এখানে যোগদান করবেন।

মো. আল মামুন সরদার বলেন,সীমানুর খাতুন একজন সংগ্রামী নারী।তার স্বামীর রিকশা চালানোর অর্থ দিয়ে তিনি এমএ পাস করেছেন।এমন একজন নারীকে আমাদের এখানে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পেরে আমরাও বেশ আনন্দিত।তার মতো আরও যারা সংগ্রামী নারী রয়েছেন তাদের কাছে এটি একটি দৃষ্টান্ত হবে।

আরও খবর

Sponsered content