জাতীয়

ক্ষমতার পালাবদলেও থামেনি খুন: পরিসংখ্যানে বাড়ছে হত্যাকাণ্ড,আতঙ্কে জনজীবন

  প্রতিনিধি ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ , ৭:২৩:৩৩ প্রিন্ট সংস্করণ

ক্ষমতার পালাবদলেও থামেনি খুন: পরিসংখ্যানে বাড়ছে হত্যাকাণ্ড,আতঙ্কে জনজীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক।।ক্ষমতার পালাবদল,রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস—কোনোটিই দেশে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের প্রবণতা থামাতে পারেনি।২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে যেমন নিয়মিত খুনের ঘটনা ঘটেছে,অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে।বরং পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান বলছে,সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিছু ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা আরও বেড়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এখনও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।শহর থেকে গ্রাম—প্রতিদিন প্রকাশ্যে গুলি,কুপিয়ে হত্যা ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের খবরে আতঙ্ক বাড়ছে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে।

বছরের পর বছর উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী,২০২১ সাল থেকে দেশে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা প্রায় স্থবির থাকলেও ২০২৪ সালে তা আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়।

২০২১ সালে হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয় ৩,২১৪টি

২০২২ সালে ৩,১২৬টি

২০২৩ সালে ৩,০২৩টি

২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩,৪৩২টিতে

বিশ্লেষকরা বলছেন,সংখ্যার এই ওঠানামা দেখাচ্ছে—দীর্ঘদিন ধরেই হত্যাকাণ্ড একটি কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে, যা কেবল সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য নয়।

৫ আগস্টের পরও চিত্র বদলায়নি

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়।এরপর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও আগস্ট থেকে ডিসেম্বর—এই পাঁচ মাসে থানাগুলোতে হত্যা মামলা হয়েছে ১ হাজার ৫৭৩টি। শুধু আগস্ট মাসেই মামলা নথিভুক্ত হয় ৬২৬টি।

তবে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী,আগস্ট মাসে নথিভুক্ত মামলার মধ্যে ১৫৮টি মামলা ছিল ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগের বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়। অর্থাৎ দীর্ঘদিন চাপা থাকা অনেক ঘটনা সরকার পরিবর্তনের পর মামলা হিসেবে সামনে এসেছে।

পুরোনো হত্যার নতুন মামলা

২০২৫ সালেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ফেব্রুয়ারিতে নথিভুক্ত ৩০০ হত্যা মামলার মধ্যে ২৪টি

মার্চে ২৯টি

এপ্রিলে ১৯টি মামলা

এসবই আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নতুন করে দায়ের হওয়া মামলা। সব মিলিয়ে ৫ আগস্টের পর এখন পর্যন্ত ২৩০টি পুরোনো হত্যাকাণ্ডের মামলা দায়ের হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন,ওই সময় ভুক্তভোগীরা মামলা করার সুযোগ পাননি বা ভয় ও রাজনৈতিক চাপের কারণে সাহস করেননি। সরকার পরিবর্তনের পর সেই ভয় কিছুটা কাটায় পুরোনো ঘটনাগুলো আইনি প্রক্রিয়ায় আসছে।

কেন থামছে না হত্যাকাণ্ড?

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন,রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে যে মানসিক ট্রমা ও সাংগঠনিক দুর্বলতা তৈরি হয়েছে,তা এখনও কাটেনি।এর সুযোগে অপরাধী চক্র আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে।অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার কার্যক্রম কার্যকরভাবে পরিচালিত না হওয়া এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তি না হওয়াও বড় কারণ।

গুম সংক্রান্ত কমিশনের সদস্য ও মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন,“বর্তমানে যেসব হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে, তা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর ভূমিকার ঘাটতি স্পষ্ট। দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।”

দায়মুক্তির সংস্কৃতি ও নির্বাচন ঝুঁকি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মো. তৌহিদুল হক মনে করেন,“হত্যাকাণ্ডসহ গুরুতর অপরাধে আইনের প্রয়োগ যথাযথ না হওয়ায় অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির মানসিকতা তৈরি হয়েছে।তারা ভাবছে—অপরাধ করেও পার পাওয়া যাবে।”

তিনি আরও বলেন,সামনে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা,আধিপত্য বিস্তার,চাঁদাবাজি ও পুরোনো শত্রুতার কারণে হত্যাকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ছে।“অপরাধী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের পরিচয় নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনতে না পারলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়,” বলেন তিনি।

পুলিশের বক্তব্য

হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বাড়াকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হিসেবে দেখা হচ্ছে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন,“সংখ্যার দিক থেকে হত্যাকাণ্ড কমার স্পষ্ট প্রবণতা এখনও নেই।তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগের অনেক হত্যাকাণ্ডও পরবর্তী সময়ে মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে।প্রতিটি ঘটনাকে আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করতে হয়।”

নির্বাচন সামনে রেখে সহিংসতার আশঙ্কা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুলিশ সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় আগেভাগেই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং সব ইউনিটকে নিয়মিত ও কঠোর অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

উপসংহার

পরিসংখ্যান ও বাস্তব চিত্র মিলিয়ে স্পষ্ট—দেশে হত্যাকাণ্ড এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়,বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী আইনশৃঙ্খলা সংকট। সরকার যেই থাকুক না কেন,সাধারণ মানুষের প্রধান চাওয়া একটাই—নিরাপদ জীবন।আর সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধ দমনে কঠোর,দ্রুত ও নিরপেক্ষ আইনি পদক্ষেপই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আরও খবর

Sponsered content