প্রতিনিধি ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ , ৭:০২:০৭ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক।।ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর গত ১৬ মাসে বাংলাদেশজুড়ে মাজার,দরগাহ ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলা,ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাসা সেন্টার ও মাকাম (ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ)–এর তথ্য অনুযায়ী,এ সময় অন্তত ১১৩টি মাজার ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ঘটনাগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়; বরং ধর্মীয় মতাদর্শগত বিরোধ,প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে সংঘটিত একটি ধারাবাহিক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।

সারসংক্ষেপ (Key Findings)
মোট হামলা: অন্তত ১১৩টি (১৬ মাসে)
ঢাকা বিভাগ: ৩৭টি প্রমাণিত হামলা (৯ জেলা)
চট্টগ্রাম বিভাগ: ২৭টি প্রমাণিত হামলা (৫ জেলা)
আহত: নারীসহ অন্তত ২১১ জন (ঢাকা: ~১৮০; চট্টগ্রাম: ~৩১)
নিহত: কমপক্ষে ২ জন
পরিত্যক্ত মাজার: অন্তত ৩০টি+
বন্ধ ওরস: অন্তত ৩০টি
প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা: ঢাকা বিভাগে ~৮০%, চট্টগ্রামে ~৯০%
সময়রেখা ও প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের আগস্ট–সেপ্টেম্বর: মোট হামলার প্রায় ৭০% ঘটে—প্রশাসনিক শূন্যতা ও আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতার সুযোগে।
২০২৫ সালের জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি: ওরস/মিলাদুন্নবী উপলক্ষে হামলা পুনরায় বৃদ্ধি পায়।
সরকারি বিবৃতি: ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট থেকে সাড়ে পাঁচ মাসে ৪০টি স্থাপনায় ৪৪টি হামলার কথা স্বীকার; ২৩ জন গ্রেপ্তার।
সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা: রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ
৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫—নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার দরবার শরিফে কথিত ‘তৌহিদী জনতা’র হামলায় কবর থেকে মরদেহ তুলে পুড়িয়ে ফেলা হয়।অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। ঘটনার পর দরবারের কার্যক্রম বন্ধ; পরিবার ও অনুসারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
ঢাকা বিভাগ: ৩৭টি হামলা (প্রমাণিত)
জেলা-ভিত্তিক: নরসিংদী (১১), ঢাকা (৯), নারায়ণগঞ্জ (৫), কিশোরগঞ্জ (৩), মানিকগঞ্জ (৩), শরীয়তপুর (২), গাজীপুর (২), রাজবাড়ী (১), টাঙ্গাইল (১)
কারণ বিশ্লেষণ:
‘শিরক–বেদাত’ আখ্যা: ~৬৫%
সামাজিক অভিযোগ (মাদক/অসামাজিক): ~১৫%
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা: ~২০%
প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া: ~৮০% ঘটনায় মামলা/গ্রেপ্তার/তদন্তে অগ্রগতি নেই। কেবল কয়েকটি ঘটনায় (রাজবাড়ী,নরসিংদী, ঢাকা) সীমিত ব্যবস্থা।
চট্টগ্রাম বিভাগ: ২৭টি হামলা (প্রমাণিত)
জেলা-ভিত্তিক: কুমিল্লা (১৭), চট্টগ্রাম (৪), নোয়াখালী (৩), ব্রাহ্মণবাড়িয়া (২), কক্সবাজার (১)
কারণ বিশ্লেষণ:
‘শিরক–বেদাত’: ~৫৫%
সামাজিক/জমি বিরোধ: ~৩০%
রাজনৈতিক: ~১৫%
প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া: ~৯০% ঘটনায় নিষ্ক্রিয়তা; মাত্র তিনটি ঘটনায় মামলা ও গ্রেপ্তার।
হামলার ধরন
ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ
ভক্তদের ওপর হামলা
সম্পদ লুটপাট
ওরস/মেলা বন্ধে বাধা
মতামত ও বিশ্লেষণ
ফরহাদ মজহার: একমাত্রিক সত্য চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা ফ্যাসিজমের লক্ষণ; সরকার শক্ত হাতে বিশৃঙ্খলাকারীদের দমন করতে পারেনি।
আনু মুহাম্মদ: এগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; পরিকল্পিত সহিংসতা ও সুযোগসন্ধানী লুটপাট চলছে—কার্যকর জবাবদিহি অনুপস্থিত।
হেফাজতে ইসলাম (মহিউদ্দিন রাব্বানী): আইন হাতে নেওয়া ইসলামসম্মত নয়—হামলা বৈধতা পায় না।
আইনি পদক্ষেপ ও ক্ষয়ক্ষতি
রাসা সেন্টারের রিটে ৫১০ কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব দাখিল; হাইকোর্টে শুনানি প্রক্রিয়াধীন।
উপসংহার
১৬ মাসে মাজারে হামলার ধারাবাহিকতা ধর্মীয় মতাদর্শগত সংঘাত, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সম্মিলিত ফল। কার্যকর নিরাপত্তা, দ্রুত তদন্ত, জবাবদিহি এবং ধর্মীয়–সাংস্কৃতিক বহুত্বের সুরক্ষা ছাড়া এ সহিংসতা বন্ধ হবে না।















