প্রতিনিধি ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ , ৪:৫৯:০৮ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক।।দেশে ২০২৫ সালে পৃথক হামলার ঘটনায় অন্তত ৬০১ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।গড়ে প্রতি মাসে ৫০ জন এবং প্রতিদিন ১ জনের বেশি পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হয়েছেন।মাঠপর্যায়ে অপরাধ দমন,আসামি গ্রেপ্তার,সামাজিক ও রাজনৈতিক বিরোধ নিয়ন্ত্রণ এবং ভঙ্গুর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে উচ্ছৃঙ্খল জনতার দলবদ্ধ হামলায় আহত হন তাঁরা।

পুলিশ সদর দপ্তরের মাসিক অপরাধ পরিসংখ্যান ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, অধিকাংশ পুলিশ সদস্য ‘মব’ সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে হামলা ছিল পরিকল্পিত ও ভয়াবহ।গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কয়েকজন পুলিশ সদস্যের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে,যদিও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া যায়নি।
সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার ময়মনসিংহের দিগরকান্দা ফিশারি মোড় এলাকায় আসামি ধরতে গেলে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।এ সময় পুলিশের পাঁচ সদস্যকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়।কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মো. নাজমুস সাকিব জানান,বিকেল ৪টার দিকে আসামি আরিফুল ইসলামকে গ্রেপ্তারের সময় তার সহযোগীরা পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে হাতকড়াসহ আসামিকে ছিনিয়ে নেয়।আহত পুলিশ সদস্যরা বর্তমানে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানার শতাধিক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,সাম্প্রতিক সময়ে অভিযানে গেলেই পুলিশ সদস্যদের হামলার শিকার হতে হচ্ছে।এতে তাঁদের মনোবল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।বিশেষ করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী,মহানগর পুলিশের মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) সবচেয়ে বেশি পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন—মোট ৮৯ জন।এ হিসাবে রেঞ্জ পুলিশের মধ্যেও ঢাকা রেঞ্জে আহতের সংখ্যা সর্বাধিক।
গত ১০ জানুয়ারি পটুয়াখালী সদর উপজেলার লাউকাঠি এলাকায় সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে বরগুনা ডিএসবিতে কর্মরত পুলিশ সদস্য শহিদুল ইসলাম গুরুতর আহত হন। একই ঘটনায় তাঁর ছোট ভাই কারা পুলিশের সদস্য আনিছুর রহমান মনিরও আহত হন।এ ঘটনায় মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পটুয়াখালী সদর থানার ওসি মনিরুজ্জামান।
মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়,মার্চ মাসে সবচেয়ে বেশি ৯৬ জন পুলিশ সদস্য আহত হন।এরপর অক্টোবর মাসে ৬৯ জন এবং মে মাসে ৬২ জন।ডিসেম্বর মাসে আহতের সংখ্যা ছিল সর্বনিম্ন—২৯ জন।
ডিএমপি সূত্র জানায়,পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় গত বছর অন্তত ৩০ জনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়া হয়েছে।একই সঙ্গে পুলিশের কাছ থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও বেড়েছে।সারা দেশে অন্তত ৪৪টি হামলায় ৪১ জন আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, “পুলিশের ওপর এভাবে হামলা চলতে থাকলে একসময় জনগণকে নিজেদের ঘরবাড়ি নিজেরাই পাহারা দিতে হবে।”
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, “আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে পুলিশ হামলার শিকার হচ্ছে। নাগরিক সমাজের প্রতি আহ্বান—পুলিশকে সহযোগিতা করুন, পাশে থাকুন।” তিনি জানান,পুলিশকে আবার কর্মক্ষম ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়,পুলিশ সদস্যদের মনোবল ফেরাতে আহতদের চিকিৎসা,নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা,কাউন্সেলিং ও মাঠপর্যায়ে মতবিনিময় কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।একই সঙ্গে পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন,০পুরোনো পুলিশ আইন যুগোপযোগী করা এবং স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকুক—এটাই চায় অপরাধীরা। পুলিশের ওপর হামলা বাড়া মানে রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলার জন্য বড় হুমকি। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে পুলিশকে সহায়তা করতে হবে।”

















