প্রতিনিধি ৭ জানুয়ারি ২০২৬ , ২:০৩:৫২ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক।।আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থী মনোনয়ন যাচাই–বাছাই প্রক্রিয়া শেষ হলেও এই প্রক্রিয়া ঘিরে গুরুতর বৈষম্য,রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী,৩০০টি নির্বাচনী এলাকায় দাখিল হওয়া ২ হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্রের মধ্যে ১ হাজার ৮৪২টি বৈধ এবং ৭২৩টি বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।

রোববার রাতে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক এ এস এম হুমায়ুন কবীর স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
মনোনয়ন বাছাইয়ের সরকারি চিত্র
ইসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—
৩০০ আসনে মোট ৩,৪০৬টি মনোনয়নপত্র গ্রহণ করা হয়
প্রার্থীরা এর মধ্যে ২,৫৬৮টি মনোনয়নপত্র দাখিল করেন
যাচাই–বাছাই শেষে ১,৮৪২টি বৈধ ও ৭২৩টি বাতিল করা হয়
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কারণে তার দাখিল করা ৩টি মনোনয়নপত্র যাচাই ছাড়াই কার্যক্রম সমাপ্ত করা হয়েছে
অঞ্চলভিত্তিক চিত্রে দেখা যায়—
ঢাকা অঞ্চল: ৪৪২ দাখিল, ৩০৯ বৈধ, ১৩৩ বাতিল
ময়মনসিংহ: ৩১১ দাখিল, ১৯৯ বৈধ, ১১২ বাতিল
কুমিল্লা: ৩৫৭ দাখিল, ২৫৯ বৈধ, ৯৭ বাতিল
খুলনা: ২৭৫ দাখিল, ১৯৬ বৈধ, ৭৯ বাতিল
রাজশাহী: ২৬০ দাখিল, ১৮৫ বৈধ, ৭৪ বাতিল
রংপুর: ২৭৯ দাখিল, ২১৯ বৈধ, ৫৯ বাতিল
চট্টগ্রাম: ১৯৪ দাখিল, ১৩৮ বৈধ, ৫৬ বাতিল
বরিশাল: ১৬২ দাখিল, ১৩১ বৈধ, ৩১ বাতিল
সিলেট: ১৪৬ দাখিল, ১১০ বৈধ, ৩৬ বাতিল
ফরিদপুর: ১৪২ দাখিল, ৯৬ বৈধ, ৪৬ বাতিল
ইসি জানিয়েছে, রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৫ জানুয়ারি থেকে আপিল দায়ের করা যাবে।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ‘অস্বাভাবিক’ বাতিলের হার
তবে সরকারি সংখ্যার বাইরেও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিলের হার নিয়ে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের অভিযোগ—
১. প্রায় ৮০ শতাংশ স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে
২. একই আইনি গ্রাউন্ডে বিএনপি–জামায়াত সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের মনোনয়ন বহাল রাখা হয়েছে
৩. বহু এলাকায় বিএনপির ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থীদের পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে
এতে করে নির্বাচনী মাঠ কার্যত নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আইনি বিশ্লেষণ: সংবিধান ও নির্বাচন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে—
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা) লঙ্ঘিত হচ্ছে
অনুচ্ছেদ ১১৯ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ
Representation of the People Order (RPO) অনুযায়ী
বিদেশি নাগরিক
ঋণখেলাপি
হলফনামায় অসত্য তথ্য প্রদানকারী
এমন প্রার্থীদের মনোনয়ন বহাল থাকা আইনগতভাবে গুরুতর ত্রুটি।
আইনজ্ঞরা সতর্ক করছেন,এই বাছাই–বৈষম্য নির্বাচন শেষে গণহারে রিট, নির্বাচন বাতিল ও সাংবিধানিক সংকটের জন্ম দিতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: একতরফা ক্ষমতার পুনর্গঠন?
আওয়ামী লীগ,জাতীয় পার্টি ও ১৪ দল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে থাকলেও নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক হয়নি—বরং তৈরি হয়েছে নতুন এক বাস্তবতা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে—
নির্বাচনী মাঠ সীমিত রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে আবদ্ধ
বহু আসনে কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন অবস্থা
‘স্বতন্ত্র প্রার্থী’ ব্যবস্থার ওপর আস্থার পতন
এটি একটি নিয়ন্ত্রিত ও একপাক্ষিক নির্বাচনের কাঠামো তৈরি করছে।
সামাজিক প্রভাব: ভোটার অনাস্থা ও অংশগ্রহণ সংকট
মনোনয়ন বাতিলের উচ্চহার সাধারণ মানুষের মধ্যে—
ভোট দেওয়ার আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে
তরুণ ভোটারদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে
নির্বাচনী সহিংসতা ও অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে
সুশীল সমাজের মতে,অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন সামাজিক সংহতির জন্য হুমকি।
অর্থনৈতিক প্রভাব: অনিশ্চয়তার বার্তা
অর্থনীতিবিদরা বলছেন—
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করবে
রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে
আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে আলোচনায় সরকার দুর্বল অবস্থানে পড়বে
একটি প্রশ্নবিদ্ধ সরকার অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না বলেই আশঙ্কা।
আন্তর্জাতিক ও নিরাপত্তা প্রেক্ষাপট
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলের নজর তীক্ষ্ণ।যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ বারবার অবাধ,সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে—
অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন আন্তর্জাতিক চাপ ও ভিসানীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে
আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে
অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা চরমপন্থা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াতে পারে
উপসংহার
সরকারি হিসাব অনুযায়ী ২,৫৬৮টি মনোনয়নের বিপরীতে ৭২৩টি বাতিল—এই সংখ্যা শুধু একটি প্রশাসনিক তথ্য নয়; এটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে গভীর আস্থার সংকটের প্রতিচ্ছবি।
বিশ্লেষকদের অভিমত,বর্তমান পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে—
নির্বাচনের গণতান্ত্রিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে
যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক,তার গ্রহণযোগ্যতা দুর্বল থাকবে
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিতে পড়বে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এখন আর শুধু ভোটের লড়াই নয়—এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক কঠিন পরীক্ষা।

















