প্রতিনিধি ২ জানুয়ারি ২০২৬ , ১০:০২:৩৪ প্রিন্ট সংস্করণ
মাজহারুল ইসলাম।।একটি রাষ্ট্রের নৈতিক মৃত্যু ঘটে তখনই, যখন সে তার নাগরিকের মৃত্যুকে অস্বীকার করে।গাজী টায়ারসের ঘটনায় ঠিক সেটাই হয়েছে।অন্তত ১৮২ জন মানুষ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে—এটি আর কোনো সংখ্যা নয়,এটি একটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার নাম।অথচ আজও সেই মৃত্যুর জন্য একটি হত্যা মামলাও হয়নি,একজন অপরাধীকেও গ্রেপ্তার করা হয়নি।এ কেমন রাষ্ট্র,যেখানে মানুষ পুড়ে মরলেও বিচার শুরু হয় না?

এই আগুন দুর্ঘটনা ছিল না—রাষ্ট্রের নিজস্ব তদন্তই তা প্রমাণ করেছে।মসজিদের মাইক ব্যবহার করে লোক ডাকা হয়েছে, একাধিক ধাপে মব সংগঠিত করা হয়েছে,পরিকল্পিতভাবে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।এত কিছুর পরও রাষ্ট্র যদি বলে—“আমরা কিছুই জানি না”, তবে সেটি অজুহাত নয়,সেটি অপরাধ।কারণ অজানা থাকাও এখানে অপরাধের শামিল।
সবচেয়ে ভয়াবহ প্রশ্নটি হলো—আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোথায় ছিল? একটি ছয়তলা ভবন পাঁচ দিন ধরে জ্বলেছে,আর রাষ্ট্রের অস্ত্রধারীরা ছিল অদৃশ্য।এটি কি অক্ষমতা,নাকি নির্দেশিত নিষ্ক্রিয়তা?যদি অক্ষমতা হয়,তবে সেই ব্যর্থতার বিচার কোথায়?আর যদি নির্দেশ থাকে,তবে তা সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহের সমান।
গাজী টায়ারসের আগুন কেবল একটি ভবন পোড়ায়নি,এটি আইনের শাসনের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকেছে।কারণ যেখানে গণহত্যার পরও মামলা হয় না,সেখানে আইন কেবল বইয়ের পাতায় বন্দী থাকে।ভবন ‘পরিত্যক্ত’ ঘোষণা করে সেখানে কাউকে ঢুকতে না দেওয়া হয়েছে—এটি নিরাপত্তা নয়,এটি প্রমাণ লোপাটের কৌশল।লাশ উদ্ধার না হলে অপরাধী অচিহ্নিত থাকে,আর অপরাধী অচিহ্নিত থাকলে ক্ষমতা নিরাপদ থাকে।
এই ঘটনায় সবচেয়ে নৃশংস বাস্তবতা হলো—মৃতদের পরিবারগুলো আজও লাশ পায়নি।তারা কবর দিতে পারেনি, শোকের একটি স্বীকৃত অধিকারও পায়নি।রাষ্ট্র যেন স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে: “তোমাদের মৃতদের আমরা স্বীকার করি না।” এটি শুধু প্রশাসনিক নিষ্ঠুরতা নয়,এটি মানবিকতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
রাজনৈতিক বাস্তবতা আরও ভয়ংকর।যে মব সংস্কৃতির ওপর ভর করে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে,সেই মব আজ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিংবা সত্য বলতে—রাষ্ট্রই সেই মবের নিয়ন্ত্রণে।তাই ১২৪৩টি কারখানায় হামলার বিচার নেই,তাই শিল্পাঞ্চল অরক্ষিত,তাই বিনিয়োগ পালাচ্ছে,তাই ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে।সরকার কঠোর হতে পারছে না,কারণ কঠোর হলে তাদের নিজেদের ভিত্তিই কেঁপে উঠবে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতাও কম অপরাধ নয়।যারা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বুলি আওড়ে এই সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে,তারা আজ ১৮২ জন পুড়ে মরার ঘটনায় নিশ্চুপ। এই নীরবতা প্রমাণ করে—মানবাধিকার তাদের কাছে নৈতিক অবস্থান নয়,এটি কেবল কূটনৈতিক হাতিয়ার।
গাজী টায়ারসের বিচার না হলে একটি বার্তাই প্রতিষ্ঠিত হবে—বাংলাদেশে মানুষ হত্যা করা যায়,পুড়িয়ে মারা যায়,আর রাষ্ট্র নিশ্চুপ থাকে।এটি কোনো সভ্য রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য নয়।
আজ তাই প্রশ্ন একটাই—১৮২ জন মানুষের বিচার যদি না হয়,তবে আগামীকাল কার মৃত্যুও কি গুরুত্ব পাবে?নাকি আমরা সবাই এমন এক রাষ্ট্রে বাস করছি,যেখানে বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি?
















