প্রতিনিধি ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ , ১:৪৯:২৮ প্রিন্ট সংস্করণ
সুমন চৌধুরী,বরিশাল।।বরিশাল মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক ও সিটি করপোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র ঘাটোর্ধ্ব আলতাফ মাহমুদ সিকদারকে ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে নগরের আগরপুর রোডে ঘণ্টাব্যাপী আটকে রেখে লাঞ্ছিত করেছেন দলের একদল নেতাকর্মী।তাদের নেতৃত্বে ছিলেন ১৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য সচিব আরমান সিকদার নুন্না। একই সময়ে নুন্না প্রেস ক্লাবে ঢুকে সাংবাদিকদের গালাগাল করেন।মহানগর আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট গোলাম বাবলু গত বুধবার সদর রোড বায়তুল মোকারম মসজিদে জোহরের নামাজ পড়ে বের হলে একই ওয়ার্ডের বিএনপির আহবায়ক সাগর উদ্দিন মন্টির নেতৃত্বে তাঁকে মারধর করা হয়।

আলতাফ ও বাবলু রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও সজ্জন হিসেবে নগরীতে পরিচিত।তাদের ওপর হামলা নিয়ে বেশ সমালোচনা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে ১৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে বরিশাল নগরীতে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা একের পর এক এ রকম অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটাচ্ছেন।সরকার পতনের সাত দিনের মধ্যে নগরে বিভিন্ন খাতে দখল প্রতিষ্ঠা করেছেন তারা।এখন দখলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের মধ্যে হানাহানিও হচ্ছে।
গত ৬ আগষ্ট ব্রাউন কম্পাউন্ড এলাকায় একটি পুকুর ভরাটের অভিযোগে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিনের সাংগঠনিক পদ স্থগিত করা হয়।প্রভাবশালী নেত্রীর বিরুদ্ধে এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দৃষ্টান্তও দমাতে পারেননি দলটির নিয়ন্ত্রণহীন নেতাকর্মীকে।স্থানীয় শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রায় সবার বিরুদ্ধে রয়েছে দখল বাণিজ্যের অভিযোগ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির কয়েকজন নেতা বলেছেন, একাধিক গ্রুপ-উপগ্রুপে বিভক্ত মহানগর বিএনপি।দলে চেইন অব কমান্ড বলতে কিছু নেই।এটি দলের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
নগরীতে ক্ষমতাসীন দলের আয়ের বড় তিনটি খাত হচ্ছে- দুটি বাস টার্মিনাল,লঞ্চঘাট ও পোর্ট রোড মাছের মোকাম। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাই এগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন।এ তিনটি খাতই এখন বিএনপির নিয়ন্ত্রণে।আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল দখল করা নিয়ে বিএনপিতে প্রথম উত্তেজনা দেখা দেয়।সরকার পতনের এক সপ্তাহের মধ্যে টার্মিনাল এলাকায় হানা দেন দলের উপদেষ্টা মজিবর রহমান সরোয়ারের ভাই মোশারফ হোসেন।পাল্টা অবস্থান নেন সরকার পতনের ৭ দিনের মধ্যে নগরে বিভিন্ন খাতে দখল প্রতিষ্ঠা করেছেন দলের নেতাকর্মী
সরোয়ারবিরোধীরা।এ নিয়ে উত্তেজনার মুখে মোশারফ আড়ালে চলে গেলেও তাঁর ইশারাতেই টার্মিনাল চলছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।সরোয়ারের আরেক ভাই ওয়াহেদুর রহমান বিসিক শিল্প মালিক সমিতি ও টেম্পো শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি পদ বাগিয়েছেন,যদিও বিএনপিতে তাদের পদ নেই। বিভাগের ছয় জেলা রুটের বাস চলে রূপাতলী বাস টার্মিনাল থেকে।
মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার গত ৮ আগস্ট বরিশাল-পটুয়াখালী বাস মালিক সমিতির আহবায়ক হয়ে টার্মিনাল নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন।বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে, নগরের সাগরদী সেতুর পর দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ পুরোটাই জিয়ার
নিয়ন্ত্রণে।বাস মালিক সমিতি নিয়ে জিয়াবিরোধীদের অভিযোগও রয়েছে আয়োমী লীগের ১০ বছরে এ টার্মিনালের নিয়ন্ত্রক ছিলেন জিয়ার চাচা শ্বশুর আওয়ামী লীগ নেতা কাওছার হোসেন শিপন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নেতা জানান,সাত সদস্যের আহবায়ক কমিটির কয়েকজন জিয়ার শ্বশুরবাড়ির দিক থেকে আত্মীয়।তারা শিপনের কমিটিতেও ছিলেন।
এ বিষয়ে জিয়া উদ্দিন সিকদার বলেন,সাত সদস্যের মালিক সমিতির পাঁচজনই বিএনপির পদধারী।যে দু’জনকে তাঁর আত্মীয় বা আওয়ামী লীগ বলা হচ্ছে,তারা আওয়ামী লীগের পদধারী কেউ নন,প্রকৃত পরিবহন ব্যবসায়ী।পেশাজীবী সংগঠনে দলীয় পরিচয় মুখ্য হয় না।
কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে সরোয়ারের ভাইয়ের আধিপত্য সম্পর্কে মহানগর শ্রমিক দলের আহবায়ক ফয়েজ আহমেদ বলেন, আগে মোশারফের পরিবহন ব্যবসা ছিল।আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তিনি বাস বিক্রি করে দেন এবং টার্মিনালের ধারেকাছে যেতেন না।এখন বিভিন্ন মাধ্যমে শুনতে পাচ্ছি,মোশারফ নতুন করে বাস কিনেছেন।তিনি অনুসারীদের দিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন।
এদিকে নগরের পোর্ট রোড মৎস্য মোকাম নিয়ন্ত্রণ করছেন মৎস্যজীবী দলের মহানগরের সাধারণ সম্পাদক কামাল সিকদার,৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য সচিব আনিচুর রহমান মিলন ও ওয়ার্ড শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক খান মো. কামাল।তারা মোকামের নাম বদল করে নতুন নাম দিয়েছেন ‘শহীদ জিয়া মৎস্য পাইকারি অবতরণ কেন্দ্র’। তাদের দাবি, চারদলীয় জোট আমলে এই নামই ছিল।নাম বদল করেছিল আওয়ামী লীগ।
ঐতিহ্য হারিয়ে বহু বছর ধরে জুয়া ও মাদক কারবারের আখড়া হিসেবে পরিচিত। আওয়ামী লীগের সময় এটির নিয়ন্ত্রণে ছিলেন ৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আওয়ামী লীগ নেতা রফিকুল ইসলাম খোকন।পট পরিকর্তনের পর এটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম লিটু।মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে গত ৬ আগষ্ট রাতে ক্লাবটিতে বিএনপির আরেক পক্ষ হামলা ও ভাঙচুর করেছে।
বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়(শেবাচিম) হাসপাতালে ঠিকাদারি বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক কে এম শহীদুল্লাহ। আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত শেবাচিমের পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম ও বরিশাল শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যানসহ তিন শীর্ষ কর্মকর্তার কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কতিপয় বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে।
এসব বিষয়ে মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক আকবর হোসেন খান বলেন,৫ আগস্টের পর নগরীতে বিএনপির নামে যা হয়েছে,এতে স্থানীয় শীর্ষ নেতাদের দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আছে বলে মনে হয় না।দলের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে দ্রুত কেন্দ্রের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
কোণঠাসা সরোয়ারপন্থিরা ২০২১ সালের নভেম্বরে মহানগর বিএনপির আহবায়ক কমিটি গঠনের পর তিন দশকের একক আধিপত্য হারান উপদেষ্টা মজিবর রহমান সরোয়ার।তাঁর অনুসারীরাও মহানগরে কোণঠাসা।সর্বশেষ ১৭ সেপ্টেম্বর গণতন্ত্র দিবসে নগরে বড় সমাবেশে তারা ছিলেন উপেক্ষিত।তারা সমাবেশ মঞ্চ থেকে প্রায় আধাকিলোমিটার দূরে বরিশাল ক্লাবের সামনে অবস্থান নিয়েছিলেন।সরোয়ার অনুসারী মহানগরের সাবেক সহসম্পাদক আনোয়ারুল হক তারিন বলেন,বর্তমান নেতারা দলের কোনো কর্মসূচিতে তাদের ডাকেন না। দলের টানে সব কর্মসূচিতেই তারা অংশ নেন।
এ বিষয়ে মহানগরের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহবায়ক আফরোজা খানম নাসরিন বলেন,দলের প্রতিটি কর্মসূচিতে কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা হিসেবে মজিবর রহমান সরোয়ারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাঁর মাধ্যমে অনুসারীরা আমন্ত্রণ পেয়ে যান।আলাদা করে কাউকে বলা হয় না।তিনি বলেন,মহানগর কমিটি মাত্র তিন সদস্যের।এ কারণে সাংগঠনিক কাজে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।
















