প্রতিনিধি ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ , ৯:৩১:৫০ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক।।স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সাম্প্রতিক মন্তব্য—লুট হওয়া অস্ত্র নির্বাচনের সময় ব্যবহার করা হবে না—রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সক্ষমতা নিয়ে স্বস্তির বদলে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।কারণ,এখনো বিপুল সংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার বাকি,পাশাপাশি জেল পলাতক জঙ্গি ও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা অধরা।এই বাস্তবতায় বক্তব্যটি আশ্বাস নাকি দায়িত্বজ্ঞানহীন অনুমান—তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

১) বাস্তব চিত্র: অস্ত্র ও গোলাবারুদ
২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বহু স্থাপনা থেকে অস্ত্র লুট হয়।সরকারি হিসাব অনুযায়ী জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত:
মোট লুট হওয়া অস্ত্র: ৫,৭৬৩টি
উদ্ধার: ৪,৪২৮টি
এখনো নিখোঁজ: প্রায় ১,৩৩৫টি
লুট হওয়া গোলাবারুদ: ৬,৫১,৬০৯ রাউন্ড
এখনো নিখোঁজ গোলাবারুদ: ২,৫৭,০০০+ রাউন্ড
এই সংখ্যাগুলো নিজেই বলে দেয়—নিরাপত্তা ঝুঁকি ‘তাত্ত্বিক’ নয়,বাস্তব।
২) জেল পলাতক: অপরাধ ঝুঁকির দ্বিতীয় স্তর
গণঅভ্যুত্থানকালে একাধিক কারাগার থেকে বন্দি পালানোর ঘটনা ঘটে।সর্বশেষ তথ্যে:
মোট পলাতক: ২,২০০+
ফিরে আসা/গ্রেপ্তার: প্রায় ১,৫০০
এখনো পলাতক: প্রায় ৭০০
ঝুঁকিপূর্ণ প্রোফাইল: অন্তত ৭০ জন জঙ্গি ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী
এই পলাতক নেটওয়ার্ক এবং নিখোঁজ অস্ত্র—দুটি একত্র হলে সহিংসতার সম্ভাবনা বহুগুণে বাড়ে।
৩) বক্তব্যের অন্তর্নিহিত প্রশ্ন
উপদেষ্টার বক্তব্যে একটি মৌলিক প্রশ্ন অনিবার্য:
যদি নিশ্চিতভাবে বলা যায় অস্ত্র ব্যবহার হবে না—তবে কি কর্তৃপক্ষ জানে অস্ত্রগুলো কার কাছে,কোথায়?
না জানলে—এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার ভিত্তি কী?
এখানে আশ্বাসের রাজনীতি ও অপারেশনাল বাস্তবতার মধ্যে গুরুতর ফাঁক দৃশ্যমান।
৪) আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি
সরকার পুরস্কার ঘোষণা ও গোপন তথ্যদাতা সুরক্ষার কথা বলছে।কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—
অভিযানগুলো খণ্ডিত ও প্রতিক্রিয়াশীল, সমন্বিত গোয়েন্দা-নির্ভর নয়।
উদ্ধার অগ্রগতির টাইমলাইন ও টার্গেট প্রকাশ নেই।
স্বচ্ছ অডিট ও পার্লামেন্টারি ওভারসাইট অনুপস্থিত।
এ অবস্থায় ‘নির্বাচনের সময় ব্যবহার হবে না’—এ বক্তব্য নীতিগত আশ্বাস হলেও কার্যকর পরিকল্পনার বিকল্প নয়।
৫) সাংবিধানিক বিশ্লেষণ
সংবিধান নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষাকে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যখন:
বিপুল অস্ত্র বাইরে,
জঙ্গি ও দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি পলাতক,
নির্বাচনকালীন সহিংসতার ইতিহাস বিদ্যমান— তখন নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়া নির্বাচন আয়োজন সাংবিধানিক কর্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক প্রশ্ন তোলে।এ কারণেই নির্বাচন স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিটের যৌক্তিকতা তৈরি হয়।
৫ক) হাইকোর্টে রিট মামলা: আইনি ভিত্তি ও আবেদন
লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ সম্পূর্ণ উদ্ধার না হওয়া এবং জেল পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে।রিটে মূলত যে বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে—
রাষ্ট্রের ব্যর্থতা: সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।বিপুল অস্ত্র ও জঙ্গি বাইরে থাকা অবস্থায় নির্বাচন আয়োজন এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার শামিল।
নির্বাচনী পরিবেশ: নির্বাচনকালীন সহিংসতা রোধে কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ভোটাধিকার অর্থবহ থাকে না,যা সংবিধানের ১১ ও ৫৯ অনুচ্ছেদের চেতনার পরিপন্থী।
পূর্ব নজির: অতীতে সহিংসতা ও অনিরাপদ পরিবেশ বিবেচনায় উচ্চ আদালত ও নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচন স্থগিত করেছে—জাতীয় নির্বাচনও ব্যতিক্রম হতে পারে না।
প্রার্থিত প্রতিকার: (ক) লুট হওয়া সকল অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার এবং (খ) পলাতক জঙ্গি ও সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের গ্রেপ্তার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন স্থগিত রাখার নির্দেশনা।
রিটটি বিচারাধীন থাকায় বিষয়টি এখন কেবল রাজনৈতিক বিতর্ক নয়—একটি সক্রিয় সাংবিধানিক প্রশ্ন।
৬) রাজনৈতিক প্রভাব
বিরোধী পক্ষ এই বক্তব্যকে ‘অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণের দাবি’ হিসেবে দেখছে।
ক্ষমতাসীনরা এটিকে স্থিতিশীলতার বার্তা বললেও মাঠপর্যায়ের তথ্য তা সমর্থন করে না।
ফলত,আস্থার ঘাটতি গভীর হচ্ছে—যা নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
৭) সামাজিক নিরাপত্তা ও জনমনে উদ্বেগ
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন সরল:
অস্ত্র উদ্ধার না হলে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা,চাঁদাবাজি,টার্গেট কিলিং ঠেকাবে কে?
নির্বাচনের বাইরে সময়েও কি এই অস্ত্র নিরাপদ থাকবে?
উত্তরহীনতা সামাজিক আতঙ্ক বাড়াচ্ছে।
৮) আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও কূটনৈতিক অংশীদাররা সাধারণত তিনটি সূচক দেখে:
অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ,
সহিংসতা-মুক্ত পরিবেশ,
প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা।
এই সূচকগুলো দুর্বল হলে নির্বাচনের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
৯) সুপারিশ (কঠোর)
১. সম্পূর্ণ উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন স্থগিত—অন্তর্বর্তীকালীন নিরাপত্তা রোডম্যাপ প্রকাশ।
২. স্বাধীন জাতীয় অস্ত্র অডিট কমিশন গঠন ও সাপ্তাহিক অগ্রগতি প্রকাশ।
৩. পলাতক জঙ্গি ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ধরতে যৌথ টাস্কফোর্স—সময়সীমা নির্ধারণ।
৪. পার্লামেন্টারি ও বিচারিক ওভারসাইট নিশ্চিতকরণ।
৫. দায়িত্বশীল বক্তব্য: প্রমাণ-ভিত্তিক আশ্বাস, অনুমানভিত্তিক নয়।
উপসংহার
রাষ্ট্রের শীর্ষ নিরাপত্তা দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির বক্তব্য কেবল রাজনৈতিক বার্তা নয়—তা জননিরাপত্তার চুক্তি।যখন ১,৩৩৫টি আগ্নেয়াস্ত্র ও লাখো রাউন্ড গোলাবারুদ বাইরে,তখন ‘ব্যবহার হবে না’ বলা যথেষ্ট নয়।উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকি থেকেই যায়—এটাই বাস্তবতা।এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে নির্বাচন এগোলে তা কেবল বিতর্ক নয়,ভবিষ্যৎ সহিংসতার দায়ও ডেকে আনতে পারে।

















