অপরাধ-আইন-আদালত

মেঘনার চরে মুখোমুখি বিএনপির দুই পক্ষ

  প্রতিনিধি ১২ ডিসেম্বর ২০২৪ , ২:৪৭:৫৮ প্রিন্ট সংস্করণ

বরিশাল ব্যুরো।।মেঘনায় একটি ইউনিয়নের সমান আয়তনের এক চরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে বিরোধ বেধেছে।প্রায় ৪০ বছর আগে জেগে ওঠা চরটি সব সময় ক্ষমতাসীন দলের নেতারা ভোগ করতেন।আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জমির মালিকরা দখলদারদের উৎখাতে সংগঠিত হয়েছেন।পাকা আমন ধানে দখলদারদের ভাগ বসানো প্রতিহত করতে চান তারা। জমির মালিকরা সভা করে সাত দিনের মধ্যে জমি দখলে নিয়ে ঘর তোলার ঘোষণা দিয়েছেন।পাল্টা আরেকটি সভা করে আরেক দলও নিজেদের মালিক বলে দাবি করছে।

দুই পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্থানীয় বিএনপির তুই নেতা।তাদের পাল্টাপাল্টি অবস্থানে বড় ধরনের সংঘাতের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।এতে আতঙ্কে আছেন চরে বাস করা সহস্রাধিক কৃষক ও তাদের পরিবার।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,কানিবগাক্য’ নামে চরের চারটি মৌজা নিয়ে বরিশালের হিজলা উপজেলার গৌরাব্দি ও মেহেন্দীগঞ্জের গোবিন্দপুর ইউনিয়নের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।দুই ইউনিয়নের বাসিন্দারাই এসব মৌজার জমির মালিকানা দাবি করছেন।বিরোধের কারণে প্রশাসন সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি বহু বছর ধরে জিইয়ে রেখেছে।দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নব্য ক্ষমতাধররা চরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় মরিয়া।এ থেকেই নতুন বিরোধের সূত্রপাত।

স্থানীয়রা জানান,চরে ধান,সয়াবিন ও সবজি চাষ, হোগলাপাতা বিক্রি,মহিষ চরানো এবং মাছ আহরণ খাত থেকে দখলদারদের বছরে কয়েক কোটি টাকা আয় হয়। ধানসহ সব ফসলের চার ভাগের এক ভাগ প্রদান এবং মাছ আহরণ ও মহিষ চরাতে লাখ লাখ টাকায় দখলদারদের সঙ্গে চুক্তি করতে হয়। ৫ আগস্টের পর চরটি দখলে নিয়েছেন মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মিজান মাঝি।রেকর্ডীয় মালিকদের নিয়ে তাঁকে হটাতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন হিজলা উপজেলা বিএনপির আহবায়ক আবদুল গাফফার তালুকদার।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,আশির দশকে মেহেন্দীগঞ্জ ও হিজলা উপজেলাসংলগ্ন মেঘনায় চরটি জেগে ওঠে।স্থানীয়রা এটিকে ‘গোবিন্দপুর চর’ বলেন।১৭টি মৌজায় এর আয়তন প্রায় ৪০ হাজার একর।এর মধ্যে ১৭ হাজার ৭২৯ একর রেকর্ডীয় এবং অবশিষ্ট অংশ খাসজমি। হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ থেকে ট্রলারে এ চরে পৌঁছাতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে।চরটি লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার মূল ভূখণ্ডের কাছেই,অর্থাৎ রায়পুর থেকে সরাসরি সড়কপথে প্রবেশ করা যায়।হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ ছাড়াও রায়পুর ও চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার লোকজনও ওয়ারিশ সূত্রে চরে জমির মালিক।

“নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্থানীয় বিএনপির দুই নেতা”আতঙ্কে সহস্রাধিক কৃষক পরিবার!

জানা গেছে,২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকারের প্রথম ভাগেও ওয়ারিশ মালিকরা চরের জমি ভোগ করতেন।শেষ ভাগে এসে দখলদারদের রাজত্ব শুরু হয়।আওয়ামী লীগের আমলে মালিকদের উৎখাত করে পুরো চর দখল করে তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা।

আওয়ামী লীগের আমলে প্রথমবার দখলে নেয় মেহেন্দীগঞ্জের উলানিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জামাল মোল্লা ও তাঁর ভাই গোবিন্দপুরের বেল্লাল মোল্লার পরিবার।এর পর বেশ কয়েক হাত ঘুরে আবারও মোল্লা পরিবারের দখলে ছিল।৫ আগস্টের পর তারা আত্মগোপনে যান।এ পরিস্থিতিতে মালিকরা দখল ফিরে পেতে হিজলা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল গাফফার তালুকদারের নেতৃত্বে সংগঠিত হতে শুরু করেন।এ মাসের শুরুর দিকে তারা চরে সভা করেন।গত রোববার গৌরাব্দি ইউনিয়নে আরেকটি সভায় গাফফার ঘোষণা দেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে প্রত্যেক মালিক যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করে যার যার জমি দখলে নিয়ে ঘর তুলবেন।

রায়পুরের আনোয়ার হোসেন জানান,আওয়ামী লীগের দখলদাররা আত্মগোপন করলে মিজান মাঝি চরের দখল নিয়েছেন।আগের দখলদাররা সরকার পতনের আগে শুধু মহিষ চরানো বাবদ এক বছরের জন্য ৩৮ লাখ টাকা আদায় করেছেন।

হিজলার বিএনপি নেতা গাফফার তালুকদার জানান,এ চরের পুরোটা হিজলা-গৌরান্দি ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত।যুগের পর যুগ মেহেন্দীগঞ্জের নেতারা পালাক্রমে চরটি দখলে রেখেছেন। কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছেন।ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশে প্রকৃত মালিকরা জমি দখলমুক্ত করবেন।তিনি তাদের সহায়তা দিচ্ছেন।

অন্যদিকে দখলদার হিসেবে অভিযুক্ত মেহেন্দীগঞ্জের মিজান মাঝি বলেন,চরের চারটি মৌজা মেহেন্দীগঞ্জের গোবিন্দপুর ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত।তবে ভুয়া মালিক দেখিয়ে পুরো চর দখলের পাঁয়তারা করছেন গাফফার।প্রকৃত মালিকরা দখলে নেই স্বীকার করে মিজান বলেন,তিনি প্রকৃত মালিকদের দখল বুঝে নিতে সহায়তা করছেন। এতে প্রতিপক্ষ তাঁকে দখলদার বলে প্রচার করছে।

মেহেন্দীগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মশিউর রহমান বলেন,সীমানা বিরোধ নিরসনের জন্য জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে সরেজমিন প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে।তারা এ নিয়ে কাজ করছেন।

আরও খবর

Sponsered content