প্রতিনিধি ৮ জানুয়ারি ২০২৬ , ১২:২৩:১১ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক।।সরকার কর্তৃক নিবন্ধিত কোনো মিডিয়া হাউজের সাংবাদিক কি না—এই সাধারণ যাচাই প্রক্রিয়াটুকু কার্যকরভাবে প্রয়োগ করলেই ভুয়া সাংবাদিক সমস্যার বড় একটি অংশ সমাধান সম্ভব।কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।বর্তমানে ফেসবুকে একটি পেজ,ইউটিউবে একটি চ্যানেল কিংবা একটি সাধারণ ওয়েবসাইট খুলে নিজের মতো করে প্রেস কার্ড বানিয়ে গলায় ঝুলিয়ে সাংবাদিক পরিচয়ে মাঠে নেমে পড়ছে অসংখ্য ব্যক্তি।সারাদেশে এদের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।এর ফলে প্রকৃত গণমাধ্যমকর্মীদের পাশাপাশি রাষ্ট্র, সমাজ ও গণতন্ত্র গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

আইনগত বিশ্লেষণ
বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যম পরিচালনা ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে প্রেস কাউন্সিল আইন ১৯৭৪,ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ (বর্তমানে সংশোধিত সাইবার আইন),তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন,এবং জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা প্রযোজ্য। ভুয়া পরিচয়ে সাংবাদিকতা করা স্পষ্টতই প্রতারণা,পরিচয় জালিয়াতি ও অবৈধ সুবিধা গ্রহণের শামিল,যা দণ্ডবিধির ৪২০ ধারাসহ একাধিক আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবুও নিবন্ধন ও স্বীকৃতির কেন্দ্রীয় ডাটাবেস না থাকায় এই অপতৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
সামাজিক প্রভাব
ভুয়া সাংবাদিকদের কারণে সমাজে গণমাধ্যমের প্রতি আস্থা দ্রুত কমছে।চাঁদাবাজি,ব্ল্যাকমেইল,ব্যক্তিগত সম্মানহানি ও মিথ্যা সংবাদের বিস্তারের জন্য সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহৃত হওয়ায় সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত ও আতঙ্কিত হচ্ছে।এর ফলে প্রকৃত সাংবাদিকরাও সামাজিকভাবে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।
রাজনৈতিক প্রভাব
রাজনৈতিক অঙ্গনে ভুয়া সাংবাদিকরা নানা সময়ে অপপ্রচার, গুজব ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ ছড়িয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করছে।নির্বাচনকালীন সময়ে এই সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করে,যা নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বিভিন্ন মানবাধিকার ও গণমাধ্যম পর্যবেক্ষক সংস্থা।ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স,ডেমোক্রেসি ইনডেক্স ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
মানবাধিকার বিশ্লেষণ
ভুয়া সাংবাদিকতার মাধ্যমে মিথ্যা অভিযোগ,মানহানি ও ব্ল্যাকমেইলের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত মর্যাদা, গোপনীয়তা ও ন্যায়বিচারের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।একই সঙ্গে প্রকৃত সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ছে।
গণমাধ্যম ও নৈতিকতা
গণমাধ্যমের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা,নৈতিকতা ও জবাবদিহি।ভুয়া সাংবাদিকরা এই ভিত্তিকে ভেঙে দিচ্ছে। সম্পাদকীয় নীতিমালা,রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড ও পেশাগত প্রশিক্ষণের বাইরে থেকে তারা গণমাধ্যমের নামে অপকর্ম চালাচ্ছে।
সার্বিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় ঝুঁকি
ভুয়া সাংবাদিক পরিচয়ে সংবেদনশীল স্থানে প্রবেশ,তথ্য সংগ্রহ ও বিকৃত তথ্য প্রচার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী,প্রশাসন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার তথ্য অপব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
করণীয় ও সুপারিশ
১. সরকার কর্তৃক কেন্দ্রীয় সাংবাদিক নিবন্ধন ও ডিজিটাল ভেরিফিকেশন সিস্টেম চালু।
২. নিবন্ধিত মিডিয়া হাউজ ও সাংবাদিকদের জন্য ইউনিফর্ম ডিজিটাল প্রেস আইডি বাধ্যতামূলক করা।
৩. ভুয়া সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
৪. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম মনিটরিং জোরদার।
৫. প্রকৃত সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও পেশাগত মর্যাদা রক্ষায় নীতিগত সংস্কার।
ভুয়া সাংবাদিকতার লাগাম টানতে এখনই কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে গণমাধ্যম,গণতন্ত্র এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা আরও গভীর সংকটে পড়বে—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকল মহলের দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ সময়ের দাবি।

















