জাতীয়

নির্বাচনে প্রশিক্ষণ ভাতা নিয়ে ইসির বিরুদ্ধে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অবস্হান

  প্রতিনিধি ১৭ ডিসেম্বর ২০২২ , ৮:৪৫:০৮ প্রিন্ট সংস্করণ

নিজস্ব প্রতিবেদক।।নির্বাচনী প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষকদের সম্মানী ভাতা নির্ধারণ করা নিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। ইসি প্রশিক্ষক হিসেবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের জন্য প্রতি দেড় ঘণ্টার একটি সেশনে (নির্ধারিত সময়) সাড়ে সাত হাজার টাকা সম্মানী নির্ধারণ করেছিল।

কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় এতে অসম্মতি জানিয়েছে। প্রশিক্ষকের অন্যান্য পদেও ইসি যে সম্মানী নির্ধারণ করেছিল, অর্থ মন্ত্রণালয় তা কমিয়ে দিয়েছে।

তবে ইসির নির্ধারণ করা সম্মানীর পরিমাণ কমানোর কোনো এখতিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় রাখে না বলেই মনে করে কমিশন। সাংবিধানিক এই সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন,আইন অনুযায়ী প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয় স্বাধীন।যেভাবে অর্থ মন্ত্রণালয় কাজটি করেছে,তা আইনানুগ হয়নি উল্লেখ করে তাদের চিঠি দেওয়ার কথা ভাবছে ইসি।

নির্বাচন কমিশন ও এর কর্মকর্তারা সরকারি বেতন-ভাতা পেয়ে থাকেন।তাই প্রশিক্ষণের জন্য তাঁদের আলাদা করে সম্মানী নেওয়া অযৌক্তিক।

বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক, সুজন

প্রতিটি নির্বাচনের আগে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, পোলিং কর্মকর্তাসহ নির্বাচন–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয় নির্বাচন কমিশন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের আগে প্রশিক্ষণের জন্য বিভিন্ন পদ সৃষ্টি করে ভাতা দিয়ে আপত্তির মুখে পড়েছিল নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন কমিশন।তখন প্রশিক্ষক হিসেবে ‘বিশেষ বক্তা’, ‘কোর্স উপদেষ্টা’সহ কয়েকটি পদ তৈরি করে সারা দেশে তিন কোটি টাকার বেশি সম্মানী ভাতা দেয় ইসি।নির্বাচন কমিশনাররাও বিশেষ বক্তা হিসেবে ভাতা নিয়েছিলেন।এটা নিয়ে তখন বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।ওই সময় রাজস্ব অডিট অধিদপ্তর বলেছিল,নির্বাচনী প্রশিক্ষণের জন্য কোর্স উপদেষ্টা,বিশেষ বক্তাসহ ইসির তৈরি করা কয়েকটি পদ অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদিত নয়।ওই সব পদের বিপরীতে ভাতা প্রদানের ফলে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।অডিট অধিদপ্তরের আপত্তি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

ইসি সচিবালয় সূত্র জানায়,গত ফেব্রুয়ারি মাসে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশিক্ষকদের ভাতার বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়।তাতে দেড় ঘণ্টার প্রশিক্ষণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচন কমিশনারদের জন্য আগের মতোই সাড়ে সাত হাজার টাকা সম্মানী ঠিক করা হয়।এ বিষয়ে অসম্মতি জানিয়ে সরকারের অর্থ বিভাগ বলেছে,সিইসি ও নির্বাচন কমিশনাররা দায়িত্ব পালনের জন্য ‘প্রিভিলেজ অ্যাক্ট’অনুযায়ী সুবিধা পেয়ে থাকেন।তাই সম্মানী দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দেয়নি মন্ত্রণালয়।

নির্বাচন কমিশনার মো. আহসান হাবিব খান বলেন,আইনে নির্বাচন কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইনের ৭ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে,সরকার প্রতি অর্থ বৎসরে নির্বাচন কমিশনের ব্যয়ের জন্য,নির্বাচন কমিশন হইতে প্রাপ্ত প্রস্তাব বিবেচনাক্রমে,উহার অনুকূলে বাজেটে নির্দিষ্টকৃত অর্থ বরাদ্দ করিবে এবং অনুমোদিত ও নির্ধারিত খাতে উক্ত বরাদ্দকৃত অর্থ হইতে ব্যয় করিবার ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদন গ্রহণ করা নির্বাচন কমিশনের জন্য আবশ্যক হইবে না।’ তিনি বলেন,ইসির প্রেরিত প্রস্তাবে অর্থ মন্ত্রণালয় কাটছাঁট করতে পারে কি না, সেটা বিবেচ্য।নির্বাচন কমিশন নিজেদের আইনগত অবস্থান তুলে ধরে অর্থ মন্ত্রণালয়কে আবারও চিঠি দেবে।

ইসির প্রস্তাবে কোর্স পরিচালকের সম্মানী প্রস্তাব করা হয় প্রতি কোর্সের জন্য ছয় হাজার টাকা।অর্থ বিভাগ বলেছে,এটি কোর্স পরিচালকের রুটিন (কাজের অংশ) কাজ।তাই এটাতে সম্মতি দেওয়া হয়নি।কোর্স সমন্বয়কের সম্মানী ধরা হয় পাঁচ হাজার এবং সাপোর্ট স্টাফদের জন্য ভাতা ধরা হয় ৫০০ টাকা।অর্থ বিভাগ বলেছে,এগুলোও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রুটিন কাজ।এই প্রস্তাবেও অসম্মতি দিয়েছে মন্ত্রণালয়।এর বাইরে সব কটি পদে সম্মানী হিসেবে ইসি যে পরিমাণ অর্থের প্রস্তাব করেছিল,তার সবই কমিয়ে দিয়েছে অর্থ বিভাগ।যেমন জে৵ষ্ঠ সচিব,সচিব,অতিরিক্ত সচিব বা সমপর্যায়ের কর্মকর্তার ক্ষেত্রে দেড় ঘণ্টার প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষক হিসেবে পাঁচ হাজার টাকা সম্মানীর প্রস্তাব করেছিল ইসি।অর্থ মন্ত্রণালয় এটি কমিয়ে তিন হাজার টাকা করেছে।একইভাবে যুগ্ম সচিবদের ক্ষেত্রে তিন হাজার টাকা থেকে কমিয়ে দুই হাজার টাকা এবং উপসচিব বা সমপর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব (দেড় ঘণ্টার জন্য) পালন করলে দুই হাজার টাকা থেকে কমিয়ে দেড় হাজার টাকা নির্ধারণ করেছে মন্ত্রণালয়।

ইসি সূত্র বলছে,ইসির সিদ্ধান্ত এভাবে অর্থ মন্ত্রণালয় কাটছাঁট করতে পারে কি না, তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছেন নির্বাচন কমিশনাররা।তাঁদের যুক্তি হলো,অর্থ মন্ত্রণালয় ইসির জন্য যে বরাদ্দ দেয়,সেটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইসি স্বাধীন।এই ব্যয়ের জন্য পূর্বানুমোদনের প্রয়োজন নেই। অর্থ মন্ত্রণালয়কে কড়া ভাষায় পাল্টা চিঠি দেওয়ার পক্ষেও কেউ কেউ মত দেন। আবার কেউ কেউ মত দেন,অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত আমলে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।ইসি নিজেদের মতো করে প্রশিক্ষণ ভাতা দেবে।তবে এটি করা হলে পরবর্তী সময়ে আবারও অডিট আপত্তি উঠবে,তাই পদগুলোর অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়া প্রয়োজন বলেও মত আসে।

এর আগে নূরুল হুদা কমিশনের আমলে যখন প্রশিক্ষণ সম্মানী নিয়ে অডিট অধিদপ্তর আপত্তি দিয়েছিল,তখনো ইসি এই যুক্তি দিয়েছিল।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন কমিশন ও এর কর্মকর্তারা সরকারি বেতন-ভাতা পেয়ে থাকেন।তাই প্রশিক্ষণের জন্য তাঁদের আলাদা করে সম্মানী নেওয়া অযৌক্তিক।অন্যথায় এটি হবে ‘ডাবল ডিপিং’ বা একই কাজের জন্য একাধিকবার বেতন–ভাতা পাওয়া। আর স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসি যা ইচ্ছা তা করতে পারে না।

আরও খবর

Sponsered content