প্রতিনিধি ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ , ৫:২৯:১০ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক।।বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৯ দফার অন্যতম একটি দফা ছিল ক্যাম্পাসে লেজুড়বৃত্তিক দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে।গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের পর ৬ আগস্ট খোলা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।এরপরই শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানান।এ দাবিতে তারা বিভিন্ন সভা ও মানববন্ধনও করেন।
শিক্ষার্থীরা রাজনীতি চান কি না,এমন জরিপ চালিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদ। সেই জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় ৮৪ শতাংশ দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধে দাবি জানান।
এর মধ্যে গত বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে মুসলিম হলে চোর সন্দেহে তোফাজ্জল নামের ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ যুবককে পিটিয়ে মারার পর বৃহস্পতিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য বাসভবনে এক জরুরি সিন্ডিকেট সভা হয়।সেখানে ক্যাম্পাসে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সব ধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়।
রাজনীতিতে সংকট আরও প্রকট হবে?
এরপরই এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা।এমন সিদ্ধান্তকে বিশ্ববিদ্যালয় অধিকাংশ সাধারণ শিক্ষার্থী স্বাগত জানালেও,ছাত্রনেতারা বলছেন,এটি ‘হঠকারী সিদ্ধান্ত’। এটি হলে শিক্ষার্থীরা তাদের সৃজনশীলতা হারাতে পারে। এতে রাজনীতিতে সংকট আরও প্রকট হবে। যেসব সিন্ডিকেট সদস্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন,তাদের অধিকাংশই গত ‘ফ্যাসিবাদী সরকারের’ দালাল বলে মনে করছেন ছাত্রনেতারা।
এ বিষয়ে ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন,প্রথমত,বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ধারণা,তা সব সময় মুক্ত চিন্তা ও মত প্রকাশকে ধারণ করে।সেই জায়গা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্রের সঙ্গে এটা সাংঘর্ষিক।আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের যে চরিত্র রয়েছে,এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে একেবারেই বেমানান।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিষ্ঠা-পরবর্তী যে ইতিহাস,এর সঙ্গে রাজনীতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
সিন্ডিকেটের অধিকাংশ শিক্ষক ফ্যাসিবাদের দোসর
সর্বশেষ ফ্যাসিবাদী সরকার পতনের আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নেতৃত্ব এবং ছাত্র সংগঠনগুলোর যে ভূমিকা রয়েছে,এ রকম কোনও সিদ্ধান্ত এলে সেটি শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করা হবে দাবি করে তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনীতিতে যেখানে ছাত্ররাজনীতি আরও সুসংহত হওয়া প্রয়োজন,সেখানে এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে গণতন্ত্রকামী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাসহ সবাই বিস্মিত হবে; যদিও এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত আমরা জানতে পারিনি।
তিনি বলেন,আরেকটি বিষয়,যেসব সিন্ডিকেট সদস্যের উপস্থিতিতে এ রকম আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের আলোচনা শুনছি, সেই সিন্ডিকেটের অধিকাংশ শিক্ষক ফ্যাসিবাদের দোসর, যারা ছাত্রদের ওপর পুলিশ,বিজিবি, র্যাবকে গুলি করতে লেলিয়ে দিয়েছিল।
বাংলাদেশকে নেতৃত্বশূন্য করার গভীর ষড়যন্ত্র:-সিন্ডিকেটের মধ্যে দিয়ে আসা এমন ‘হঠকারী সিদ্ধান্ত’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও গণতন্ত্রকামী শিক্ষার্থী গ্রহণ করবে না উল্লেখ করে নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন,আমরা মনে করি ছাত্ররাজনীতি বন্ধের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে নেতৃত্বশূন্য করে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্র চলছে।বাংলাদেশ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেহেতু একে অপরের পরিপূরক, সুতরাং দেশ নিয়ে যেকোনও ষড়যন্ত্র এ দেশের ছাত্রসমাজ তাদের মেধা ও সৃজনশীলতা দিয়ে রুখে দেবে।
ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সৈকত আরিফ বলেন, ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের সিদ্ধান্ত না নিয়ে ছাত্ররাজনীতিকে সংস্কার করতে হবে।রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে কেউ যাতে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন-নিপীড়ন করতে না পারে,জোর করে মিছিলে নিয়ে যেতে না পারে,তা নিশ্চিত করতে হবে।ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে একাডেমিক ক্যালেন্ডারের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন থাকলে ছাত্ররাজনীতিকে কেন্দ্র করে যে সংকট তৈরি হয়েছে,সে সংকটের সমাধান হবে।রাজনীতিকে পাশ কাটিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না বরং তা সংকটকে আরও প্রকট করে তুলবে।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট ঢাবি শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মোজাম্মেল হক বলেন,ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের সময়ে গঠিত সিন্ডিকেট সদস্যরা বিরাজনীতিকীকরণের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মতামত চর্চা ও সংগঠন করার অধিকার কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।এটা গণ-অভ্যুত্থান ও ছাত্রদের গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিপন্থি।ফলে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের অগণতান্ত্রিক পরিকল্পনা দ্রুত বন্ধ করতে হবে।
শেখ হাসিনাকে পদত্যাগের আন্দোলন থামাতে সরকারি নির্দেশের আজ্ঞাবহ হয়ে গণ-অভ্যুত্থান চলাকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব সিন্ডিকেট সদস্য শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিলেন,তারাই আবার ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি স্থগিতের সিদ্ধান্তের দিকে যাচ্ছে বলে মনে করেন এসব ছাত্রনেতা।
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন মনে করে,এই অপচেষ্টা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ক্যান্টনমেন্ট বানানোর পাঁয়তারা।শুক্রবার (২০ সেপ্টেম্বর) সংগঠনের সভাপতি রাগীব নাঈম ও সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম রনির সই করা এক বিবৃতিতে এই অভিযোগ করে।
অন্তর্বর্তী সরকার বারবার ব্যর্থ হচ্ছে—–!!!!!
তারা বলেন,গণ-অভ্যুত্থান সফল করার লক্ষ্যে জাতীয় স্বার্থে দীর্ঘ সময় প্রায় সব ছাত্র সংগঠন একই বয়ানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রাজপথে হাজির ছিল।নিজেদের সাংগঠিক কাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়ে তারা লড়েছে ছাত্র-জনতার সঙ্গে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে।দুঃখের বিষয়,সহস্রাধিক মানুষের রক্তের ওপর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।তারা ভিন্নমত ও অধিকার আদায়ের সংগ্রাম দমনে স্বৈরাচারের অস্ত্র ও কৌশল প্রয়োগ করছে। ফলে গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণকারী হিসেবে শিক্ষার্থীরা যখন নিজ নিজ আদর্শিক অবস্থান থেকে সংগঠিত হয়ে প্রতিবাদ শুরু করেছে,তখনই শেখ হাসিনার আজ্ঞাবহ ঢাবির সিন্ডিকেট সদস্যরা ছাত্ররাজনীতির অধিকার কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র করছেন।
নেতারা আরও বলেন,বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চেতনা, গণ-অভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সমর্থনের অংশ হিসেবে সব ছাত্র সংগঠন নিজেদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে কার্যত স্থিমিত রাখলেও আমরা দেখেছি ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে লাশ পড়তে,মব ভায়োলেন্স তৈরি করে একের পর এক খুন চলতে,মাজার-মন্দিরে হামলা হতে। ফলে এ কথা বলার সুযোগ নেই যে ছাত্ররাজনীতি না থাকলে ক্যাম্পাস শান্ত থাকবে।
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন মনে করে,স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ গঠন করতে ও ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে যে দলকানা মনোবৃত্তিপ্রসূত প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড,দুর্নীতি,স্বজনপ্রীতি, নিয়োগ-বাণিজ্য ঠেকাতে এবং দেশে ও ক্যাম্পাসে নতুন ফ্যাসিস্টের জন্ম রুখতে সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি চর্চার সুযোগ অবারিত রাখার কোনও বিকল্প নেই।