প্রতিনিধি ৫ জানুয়ারি ২০২৬ , ৪:১৭:৩৮ প্রিন্ট সংস্করণ
ভূমি দখল, পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি ও নারী নির্যাতনের অভিযোগ—প্রথম স্ত্রীর দায়ের করা মামলায় উঠে এলো ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক:ঢাকা জেলার সাভার উপজেলার কাউন্দিয়া ইউনিয়নের মাইনকার টেক এলাকার মরহুম আলাউদ্দিন ড্রাইভারের দ্বিতীয় ছেলে সোহরাব হোসেনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি,ভূমি দখল,নারী নির্যাতন এবং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী,আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে সোহরাব হোসেন কাউন্দিয়া ইউনিয়নের কুখ্যাত ভূমিদস্যু ও আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান সাইফুল আলম খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী,সে সময় তিনি চেয়ারম্যানের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবেও পরিচিতি পান। ওই সময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তিনি ঢাকা সড়ক পরিবহন সেক্টরে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়,ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি খন্দকার এনায়েত উল্লার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করে এবং আওয়ামী লীগের কমিটির সদস্য পরিচয় ব্যবহার করে পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি,দখলদারিত্ব ও নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন সোহরাব হোসেন।
একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি,সোহরাব হোসেন গোপনে আনুমানিক আট থেকে দশটি বিয়ে করেছেন। এসব বিয়ের আড়ালে ভয়ভীতি,প্রতারণা ও অর্থলোভের মাধ্যমে বহু নারীকে আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ উঠেছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তীব্র চাপে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর চেয়ারম্যান সাইফুল আলম খান আত্মগোপনে চলে গেলেও সোহরাব হোসেন কৌশলে রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করেন।অভিযোগ রয়েছে,তিনি বর্তমানে সাভার উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও ঢাকা জেলা বিএনপির সহসভাপতি কফিল উদ্দিনের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে নিয়মিত উপস্থিত থেকে নিজেকে বিএনপি নেতা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন।একই সঙ্গে পলাতক আওয়ামী নেতা-কর্মীদের গোপনে সহায়তা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।এই রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ার আড়ালেই তিনি পুনরায় চাঁদাবাজি ও ভূমি দখলের কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়েছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
এসব অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশের পর আমাদের সমাচার-এর প্রতিনিধি সরেজমিন অনুসন্ধানে গেলে সোহরাব হোসেনের অর্থলোভী ও নির্যাতনমূলক চরিত্রের আরও ভয়াবহ চিত্র সামনে আসে।
সোহরাব হোসেনের প্রথম স্ত্রী আমেনা বেগম ২৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে নারী নির্যাতন ও যৌতুক আইনে তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন।মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগীর বক্তব্যে উঠে আসে দীর্ঘদিনের ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা।
আমেনা বেগম বলেন,“দুর্ভাগ্যবশত এই লম্পট ও অর্থলোভী মানুষটির সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিল।বিয়ের পর থেকেই সে আমার ওপর ধারাবাহিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসছে।”
তার অভিযোগ,২০১২ সালে তার মায়ের দেওয়া প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের একটি বাড়ি সোহরাব হোসেন তার অজ্ঞাতসারে বিক্রি করে দেন।পাশাপাশি তার নামে থাকা একটি বাস এবং ছেলে আদনানের নামে থাকা দুটি বাসও গোপনে বিক্রি করা হয়।
সম্প্রতি আরেকটি বিয়ে করার পর নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায় বলে দাবি করেন আমেনা বেগম।তার ভাষ্যমতে, সোহরাব হোসেন বাসার অর্ধেক আসবাবপত্র ও ছেলে আদনানের নামে থাকা তিনটি গাড়ি বিক্রি করে টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে ও তার ছেলেকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।
তিনি জানান,গত ২৫ নভেম্বর সোহরাব হোসেন তার বাসায় প্রবেশ করে এলোপাতাড়ি মারধর করে এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে চলে যান।পরে তার ছেলে আদনান তাকে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।
আমেনা বেগম আরও অভিযোগ করেন,সাভার থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা গ্রহণে গড়িমসি করে।বাধ্য হয়ে তিনি আদালতে মামলা দায়ের করেন।আদালত মামলাটি প্রাথমিক তদন্তের জন্য থানায় পাঠালেও সোহরাব হোসেন অর্থ ও প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত প্রক্রিয়া বিলম্বিত করছেন বলে তার অভিযোগ।উল্টো তার ছেলে আদনানের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে পুলিশ ব্যবহার করে তাকে গ্রেপ্তার করানো হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন,“আমি একজন অসহায় নারী।ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে আজ আমি ও আমার ছেলে অপরাধী হয়ে গেছি। সোহরাবের অর্থ ও ক্ষমতার কাছে প্রশাসন যেন রহস্যজনকভাবে নীরব।”
এ বিষয়ে অভিযুক্ত সোহরাব হোসেনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল অবিলম্বে নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।













