প্রতিনিধি ৮ জানুয়ারি ২০২৬ , ৩:২৮:৫২ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক।।দেশের কারাগারগুলো কি পরিণত হচ্ছে নীরব মৃত্যুপুরীতে? হাজতি তারিকুল ইসলামের কারাগার থেকে পাঠানো চিঠিতে নির্যাতন ও চিকিৎসা বঞ্চনার অভিযোগ সামনে আসার পরই আরও ভয়াবহ অভিযোগ ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে—কারাগারে তথাকথিত ‘স্লো পয়জন’ প্রয়োগ করে অন্তত ৮৫ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে হত্যার অভিযোগ এবং ভবিষ্যতে প্রায় ৯২ হাজার নেতাকর্মীকে টার্গেট করে পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞের আশঙ্কা।অভিযোগ সত্য হলে এটি হবে রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের অন্যতম গুরুতর মানবাধিকার অপরাধ।

এক ঘটনায় মিলেছে দুই সংকট
একদিকে হাজতি তারিকুল ইসলামের ব্যক্তিগত নির্যাতনের অভিযোগ,অন্যদিকে রাজনৈতিক বন্দীদের বিরুদ্ধে সংগঠিত ও পরিকল্পিত হত্যার আশঙ্কা—এই দুই ঘটনাই একই কাঠামোগত সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে: কারা ব্যবস্থার উপর কার্যকর নজরদারির অনুপস্থিতি এবং জবাবদিহির ভয়াবহ ঘাটতি।
তারিকুল ইসলামের চিঠিতে যেসব অভিযোগ এসেছে—শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন,প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দেওয়া, প্রশাসনিক হয়রানি—সেগুলো বাংলাদেশ সংবিধানের ৩১ ও ৩৫ অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন।অথচ অভিযোগ প্রকাশের পরও দৃশ্যমান কোনো স্বাধীন তদন্ত বা জরুরি সুরক্ষা ব্যবস্থা চোখে পড়েনি।এই নীরবতাই প্রশ্ন তুলছে: অভিযোগগুলো কি গুরুত্বহীন,নাকি গুরুত্ব দেওয়ার মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছা নেই?
‘স্লো পয়জন’ অভিযোগ: গুজব না গণহত্যার পূর্বাভাস?
কারাগারে ‘স্লো পয়জন’ প্রয়োগের অভিযোগ কোনো সাধারণ দাবি নয়।এটি সরাসরি গণহত্যার পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়। তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য—এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণ ছাড়া ছড়িয়ে পড়লে তা ভয় ও মেরুকরণ বাড়ায়।কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল অভিযোগকে গুজব প্রমাণ করা অথবা সত্য উদঘাটন করা। বাস্তবে কোনোটিই হয়নি।
যদি সত্যিই বন্দীদের খাবার,পানি বা চিকিৎসার মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিষ প্রয়োগের মতো কিছু ঘটে থাকে,তবে তা প্রমাণের জন্য প্রয়োজন:
স্বাধীন টক্সিকোলজি পরীক্ষা,
সন্দেহজনক মৃত্যু ও অসুস্থতার পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল অডিট,
সিসিটিভি ফুটেজ,রেজিস্টার ও খাদ্য সরবরাহ চেইনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ।
এই পদক্ষেপগুলো না নেওয়া মানেই রাষ্ট্র নিজেই সন্দেহের জায়গায় দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বন্দী ও বৈষম্যের অভিযোগ
কারাগারে রাজনৈতিক বন্দীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ নতুন নয়।তবে এবার অভিযোগের মাত্রা ভয়াবহ—নির্যাতন থেকে শুরু করে পরিকল্পিত হত্যার আশঙ্কা পর্যন্ত। এটি প্রমাণিত হলে কারা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা সম্পূর্ণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে বাংলাদেশ কঠোর সমালোচনার মুখে পড়বে।
জাতিসংঘের Mandela Rules অনুযায়ী বন্দীর নিরাপত্তা ও চিকিৎসা রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য দায়িত্ব।এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা কোনোভাবেই প্রশাসনিক ভুল হিসেবে খাটো করে দেখা যায় না—এটি সরাসরি অপরাধ।
রাষ্ট্রীয় দায় ও জবাবদিহির সংকট
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—এত গুরুতর অভিযোগের পরও কোনো স্বাধীন তদন্ত কমিশন,কোনো বিচারিক অনুসন্ধান,কিংবা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের জরুরি হস্তক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।এই নীরবতা শুধু ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তাকেই ঝুঁকিতে ফেলছে না,বরং পুরো কারা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধ্বংস করছে।
রাষ্ট্র যদি দ্রুত স্বচ্ছ তদন্তে না যায়,তবে আগামী দিনে প্রতিটি কারা-অসুস্থতা ও মৃত্যু ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ সন্দেহে ঢেকে যাবে—যা আইনশাসনের জন্য মারাত্মক অশনিসংকেত।
কঠোর সুপারিশ
১. হাজতি তারিকুল ইসলামের অভিযোগে অবিলম্বে স্বাধীন মেডিকেল বোর্ড ও বিচারিক তদন্ত
২. গত কয়েক বছরে কারাগারে সব মৃত্যু ও গুরুতর অসুস্থতার জাতীয় পর্যায়ের ফরেনসিক অডিট
৩. কারাগারে খাবার,পানি ও ওষুধ ব্যবস্থার ওপর র্যান্ডম টক্সিকোলজি পরীক্ষা
৪. তদন্ত চলাকালে সংশ্লিষ্ট কারা কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি বা রোটেশন
৫. জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার স্বাধীন পর্যবেক্ষণ অনুমোদন
উপসংহার
কারাগার রাষ্ট্রের শাস্তি কার্যকরের স্থান—প্রতিশোধ বা গোপন হত্যার ক্ষেত্র নয়।তারিকুল ইসলামের চিঠি এবং ‘স্লো পয়জন’ সংক্রান্ত অভিযোগ একসঙ্গে মিলিয়ে একটি ভয়াবহ সতর্কবার্তা দিচ্ছে।এখন রাষ্ট্র যদি নীরব থাকে,ভবিষ্যতে যে কোনো মৃত্যুর দায় এড়ানোর সুযোগ আর থাকবে না।সত্য উদঘাটন ও দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহিই একমাত্র পথ—এর বিকল্প নেই।

















