প্রতিনিধি ৮ জানুয়ারি ২০২৬ , ৯:২৪:৫৪ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক।।রাজধানীর উত্তরা ও নিকুঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক জালিয়াতি চক্রের মূল হোতা তিন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে ৩৬৩টি আইফোন (বিভিন্ন মডেল),বিপুল পরিমাণ খুচরা যন্ত্রাংশ এবং ৮ বোতল বিদেশি মদ।জব্দকৃত পণ্যের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় পৌনে ২ কোটি টাকা।

বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) সকালে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিবি মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মহিউদ্দিন মাহমুদ সোহেল।
🔍 গোপন কারখানায় ‘এসেম্বল আইফোন’: অভিনব প্রতারণা
ডিবির তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।গ্রেপ্তারকৃতরা বিদেশ থেকে অবৈধ পথে আইফোনের বিভিন্ন পার্টস দেশে এনে রাজধানীর গোপন ডেরায় দক্ষ কারিগর দিয়ে সেগুলো জোড়া লাগিয়ে পূর্ণাঙ্গ আইফোন তৈরি করত।পরে সেগুলো আসল আইফোনের মতো মোড়কজাত করে সাধারণ ক্রেতাদের কাছে উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হতো।
ডিসি সোহেল জানান, “এটি শুধু তিনজনের কাজ নয়। দেশীয় কিছু অসাধু মোবাইল ব্যবসায়ীও এই চক্রের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।”
⚖️ আইনি বিশ্লেষণ
এই ঘটনায় একাধিক গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হয়েছে—
১. প্রতারণা ও জালিয়াতি
দণ্ডবিধি,১৮৬০ এর ধারা ৪২০: প্রতারণার মাধ্যমে সম্পদ আত্মসাৎ
ধারা ৪৬৭ ও ৪৬৮: জাল দলিল ও নকল পণ্য প্রস্তুত
২. বিশেষ আইন লঙ্ঘন
বিশেষ ক্ষমতা আইন,১৯৭৪ (অবৈধ আমদানি ও মজুদ)
কপিরাইট আইন,২০০০ (ব্র্যান্ড নকল)
টেলিযোগাযোগ আইন,২০০১ (অননুমোদিত ডিভাইস উৎপাদন ও বিক্রি)
কাস্টমস আইন,২০২৩ (চোরাচালান)
৩. বিদেশি নাগরিক সংশ্লিষ্টতা
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা যদি ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করে ব্যবসায় জড়িত হয়ে থাকেন,তবে—ইমিগ্রেশন আইন অনুযায়ী অতিরিক্ত অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
সাজা শেষে ডিপোর্টেশন হতে পারে
🧑⚖️ মানবাধিকার ও ভোক্তা অধিকার
১. ভোক্তার অধিকার লঙ্ঘন
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন,২০০৯ অনুযায়ী—
ভেজাল ও নকল পণ্য বিক্রি সরাসরি অপরাধ
ভোক্তার আর্থিক ও তথ্যগত অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে
২. ডিজিটাল নিরাপত্তা ঝুঁকি
নকল আইফোনে—
স্পাইওয়্যার বা ম্যালওয়্যার থাকার আশঙ্কা
ব্যক্তিগত তথ্য চুরি ও নজরদারির ঝুঁকি
এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার (সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৩) লঙ্ঘনের আশঙ্কা তৈরি করে।
🏛️ সামাজিক ও জাতীয় নিরাপত্তা প্রেক্ষাপট
নকল স্মার্টফোন ব্যবহার করে
অপরাধমূলক যোগাযোগ
আর্থিক প্রতারণা
সাইবার অপরাধ
সহজ হয়,যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
বিদেশি নাগরিকদের মাধ্যমে সংগঠিত অপরাধ চক্র সক্রিয় হওয়া
আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করে
সীমান্ত ও কাস্টমস ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে
💰 অর্থনৈতিক প্রভাব
সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে
বৈধ মোবাইল ব্যবসায়ীরা অন্যায্য প্রতিযোগিতার শিকার
স্মার্টফোন বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন,এ ধরনের জালিয়াতি অব্যাহত থাকলে প্রযুক্তি খাতে বিদেশি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
🚨 পুলিশের সতর্কবার্তা
ডিসি মহিউদ্দিন মাহমুদ সোহেল বলেন,“দামি ফোন কেনার সময় গ্রাহকদের অবশ্যই অনুমোদিত শোরুম থেকে কেনা উচিত।অস্বাভাবিক কম দামে ফোন বিক্রির প্রলোভনে পড়ে প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।”
ডিবি জানিয়েছে,চক্রের সঙ্গে জড়িত দেশীয় ব্যবসায়ীদের শনাক্তে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
উপসংহার
উত্তরা–নিকুঞ্জে উদ্ধার হওয়া ‘নকল আইফোন কারখানা’ শুধু একটি প্রতারণার ঘটনা নয়; এটি—
আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ অপরাধ
ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘন
ডিজিটাল নিরাপত্তা ঝুঁকি
জাতীয় অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি
এই ঘটনায় দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের চক্র আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি কাস্টমস,বিটিআরসি ও ভোক্তা অধিকার সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।













