প্রতিনিধি ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ , ১১:৩৮:০৩ প্রিন্ট সংস্করণ
মাজহারুল ইসলাম।।অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের শুরুতেই যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল—আইনের শাসন,বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অবাধ অধিকার—তা আজ কাগুজে বুলি ছাড়া আর কিছুই নয়।বাস্তবে এই সরকারও অতীতের সরকারগুলোর পদাঙ্ক অনুসরণ করে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করছে দমন,প্রতিশোধ ও রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বাস্তবায়নের জন্য।

নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব)-এর সভাপতি এ কে আজাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই নির্মম বাস্তবতাকেই প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে।এমআরডিআই আয়োজিত নীতি সংলাপে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন—বর্তমান সরকারও বিচারব্যবস্থাকে ‘পঙ্গু’ করে রেখেছে এবং সাধারণ মানুষকে বিনাবিচারে কারাগারে পাঠাচ্ছে।এটি কোনো আবেগী মন্তব্য নয়; এটি সংবিধান,আইন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির আলোকে একটি গুরুতর অভিযোগ।
‘নজিরবিহীন স্বাধীনতা’—পরিসংখ্যান বলছে নিপীড়নের ইতিহাস
সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে,দেশে গণমাধ্যম ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ভোগ করছে। অথচ বাস্তবতার আয়নায় তাকালে যে চিত্র ফুটে ওঠে,তা স্বাধীনতা নয়—বরং একটি সংগঠিত দমননীতি।
স্বাধীনতার তথাকথিত নমুনা হিসেবে সামনে আসছে—
🔸 ৬০০+ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা
🔸 ৫০+ গণমাধ্যম ও প্রেস অফিসে হামলা
🔸 ৬ জন সাংবাদিক হত্যা
🔸 ১৮ জন সাংবাদিক গ্রেপ্তার
🔸 ১০০+ সাংবাদিক আহত
🔸 ১,০০০+ সাংবাদিক চাকরিচ্যুত বা পদত্যাগে বাধ্য
🔸 ৯৬ জন সাংবাদিকের আর্থিক বিবরণী চেয়েছে বিএফআইইউ
🔸 ১৬৮ জনের প্রেস স্বীকৃতি বাতিল
🔸 ১৮ জন সাংবাদিকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ
🔸 ৮৩ জনের প্রেস ক্লাব সদস্যপদ বাতিল
🔸 বেশিরভাগ মিডিয়া হাউসের মালিকানা জোরপূর্বক দখল
এই পরিসংখ্যান কেবল ভয়াবহই নয়,এগুলো সরাসরি বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ,আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (ICCPR)-এর ১৯ অনুচ্ছেদ, এবং জাতিসংঘের সাংবাদিক সুরক্ষা ঘোষণার পরিপন্থী।
রাষ্ট্র যখন পরিকল্পিতভাবে সাংবাদিকদের মামলা,গ্রেপ্তার, আর্থিক নজরদারি ও প্রাতিষ্ঠানিক বহিষ্কারের মাধ্যমে স্তব্ধ করে দেয়—তখন সেটি আর গণতান্ত্রিক শাসন থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র।
বিচারব্যবস্থা: আইনের শাসন না রাজনৈতিক সমঝোতার যন্ত্র?
৫ আগস্টের পর থেকে বিচারব্যবস্থায় যে ঘটনা প্রবাহ দেখা যাচ্ছে,তা কোনো স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ার প্রতিফলন নয়। বরং এটি একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ইঙ্গিত দেয়।
বিগত সরকার আমলে সাজাপ্রাপ্ত ও অভিযুক্ত আসামিদের একে একে মামলার নথিসহ খালাস দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—
২১ আগস্ট ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা মামলা
১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান মামলা
নাইকো দুর্নীতি মামলা
গ্যাটকো মামলা
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা
এসব মামলাসহ তারেক রহমানের বিরুদ্ধে থাকা মোট ৮৫টি মামলা খালাস পেয়েছে।শুধু তাই নয়,জঙ্গি-সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও যুদ্ধাপরাধে সাজাপ্রাপ্ত একাধিক আসামির মুক্তি জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
আইনের দৃষ্টিতে প্রশ্ন হলো—
➡️ এসব মামলায় কি নতুন কোনো সাক্ষ্য,প্রমাণ বা আপিল আদালতের বাধ্যতামূলক নির্দেশ ছিল?
➡️ নাকি বিচার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে?
ICCPR-এর ১৪ অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে বলে—বিচার হতে হবে স্বাধীন,নিরপেক্ষ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত।কিন্তু যখন বিচার দ্রুত হয় কেবল প্রভাবশালীদের জন্য,আর সাধারণ মানুষ বিনাবিচারে জেলে থাকে—তখন এটি স্পষ্টতই নির্বাচনী ও ক্ষমতার হিসাবের বিচার।
দ্বৈত মানদণ্ডের রাষ্ট্র: দমন নিচে, ছাড় উপরে
একদিকে—
সাংবাদিক,নাগরিক ও ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে মামলা
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ
প্রেস স্বীকৃতি বাতিল
কারাবন্দি ও হয়রানি
অন্যদিকে—
প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ধারাবাহিক খালাস
গুরুতর অপরাধে সাজাপ্রাপ্তদের মুক্তি
বিচার প্রক্রিয়ার অস্বাভাবিক ত্বরান্বিত নিষ্পত্তি
এই দ্বৈত মানদণ্ড সরাসরি আইনের সমতার নীতি ভঙ্গ করে, যা বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ ও সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার (UDHR) ৭ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।
উপসংহার: অন্তর্বর্তী সরকার না পুরনো দমননীতির নতুন সংস্করণ?
গণতন্ত্রের তিনটি মৌলিক স্তম্ভ—বিচারব্যবস্থা,গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা—এই তিনটিই আজ চরম চাপে।ফলে প্রশ্ন উঠছে,অন্তর্বর্তী সরকার কি সত্যিই পরিবর্তনের প্রতীক,নাকি কেবল ক্ষমতার কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে মুখ বদলের একটি প্রকল্প?
যদি বিচার রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী হয়,
যদি গণমাধ্যম শাস্তির ভয়ে সত্য লিখতে না পারে,
যদি মতপ্রকাশ অপরাধে পরিণত হয়—
তবে রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক থাকে না,সে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ও ভয়ভিত্তিক শাসনে পরিণত হয়।
ইতিহাস সাক্ষী—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী,কিন্তু দমননীতির দাগ স্থায়ী।
আজ যারা “নজিরবিহীন স্বাধীনতা”র গল্প শোনাচ্ছে,কাল তারাই ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াবে—পরিসংখ্যান,আইন ও মানবাধিকারের সামনে।
















