প্রতিনিধি ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৩:০১:৫৫ প্রিন্ট সংস্করণ
মাজহারুল ইসলাম।।তারেক জিয়া বক্তব্যে হাদীর প্রসঙ্গ তুললেও দীপুর মৃত্যু, ড. ইউনুসের ১৫ মাসের শাসনকাল,বিচারবহির্ভূত সহিংসতা কিংবা সাংবিধানিক সংকট—কোনো বিষয়েই নীরবতা ভাঙেননি।রাজনীতিতে এই নীরবতা নিছক কৌশল নয়; এটি একটি পরিকল্পিত অবস্থান।প্রশ্ন হলো—এই পরিকল্পনা কি সংবিধানসম্মত গণতন্ত্রের জন্য,নাকি ক্ষমতা দখলের পুরোনো ফর্মুলার পুনরাবৃত্তি?

১. সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব: নীরবতাও কি অপরাধ?
বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭(১) অনুযায়ী—
> “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ।”
একজন রাজনৈতিক নেতা,যিনি রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার প্রত্যাশা করেন,তার ওপর নৈতিক ও রাজনৈতিক দায় বর্তায় জনগণের জীবন,নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করার।
🔹 দীপুর মৃত্যু ও রাষ্ট্রীয় দায়
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২ (জীবনের অধিকার) অনুযায়ী,রাষ্ট্র ব্যর্থ হলে সেটি মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
এই বিষয়ে নীরবতা রাজনৈতিক বক্তব্যের অভাব নয়—বরং রাষ্ট্রীয় দায় এড়িয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত।
২. ১৫ মাসের শাসন ও সাংবিধানিক বৈধতা প্রশ্ন
ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান ব্যবস্থায়—
সংসদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নেই
পূর্ণাঙ্গ নির্বাচিত সরকার নেই
জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেট অনুপস্থিত
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৫ ও ৫৬ অনুযায়ী নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য সংসদের প্রতি জবাবদিহিতা অপরিহার্য।
এই প্রশ্নে তারেক জিয়ার সম্পূর্ণ নীরবতা ভবিষ্যৎ শাসনের রূপরেখা নিয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি করে।
৩. একতরফা নির্বাচন ও নির্বাচন আইন বিশ্লেষণ
১৯৯৬ বনাম ২০২৬: আইনি সাদৃশ্য
Representation of the People Order (RPO) অনুযায়ী—
অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে সেটি সাংবিধানিক বৈধতা হারায়
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা বাধ্যতামূলক
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাতিল হয়েছিল রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক চাপে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির সম্ভাব্য একতরফা নির্বাচনও একই আইনি ঝুঁকিতে।
🔹 অনুচ্ছেদ ১১ — গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের নিশ্চয়তা
এই অনুচ্ছেদ লঙ্ঘিত হলে রাষ্ট্রের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
৪. হাওয়া ভবন,দুর্নীতি ও ফৌজদারি দায়
তারেক জিয়ার বিরুদ্ধে রয়েছে—
দুর্নীতি দমন কমিশনের একাধিক মামলা
অর্থপাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
🔹 দুর্নীতি দমন আইন,২০০৪
🔹 মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন,২০১২
এই আইনগুলো অনুযায়ী সাজাপ্রাপ্ত বা দণ্ডযোগ্য ব্যক্তি রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৬ (সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা) প্রশ্নের মুখে পড়ে।
৫. আন্তর্জাতিক আইন ও ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি
রয়টার্সের সতর্কতা কেবল সাংবাদিকতা নয়—এটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।
🔹 International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR)
বাংলাদেশ এই চুক্তির স্বাক্ষরকারী।
এতে বলা আছে—
রাজনৈতিক সহিংসতা
অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন
সংখ্যালঘু সুরক্ষা
এসব ব্যর্থ হলে আন্তর্জাতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি বাড়ে।
৬. সংখ্যালঘু অধিকার ও সংবিধান
সংবিধানের
অনুচ্ছেদ ২৭ — আইনের দৃষ্টিতে সমতা
অনুচ্ছেদ ২৮ — ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ
অনুচ্ছেদ ৪১ — ধর্ম পালনের স্বাধীনতা
সংখ্যায় কম বলে সংখ্যালঘুদের ভোট অপ্রয়োজনীয় ভাবা সরাসরি সাংবিধানিক লঙ্ঘন।
এই জায়গায় শেখ হাসিনার অবস্থান সাংবিধানিকভাবে সুসংগত—রাজনৈতিকভাবে কঠিন হলেও।
৭. পাকিস্তান মডেল ও সাংবিধানিক অস্থিতিশীলতা
পাকিস্তানের ইতিহাস দেখায়—
প্রধানমন্ত্রী গ্রেফতার
সামরিক হস্তক্ষেপ
বিচারব্যবস্থার রাজনৈতিক ব্যবহার
বাংলাদেশ যদি সেই পথে হাঁটে,তবে সংবিধানের ৭ক ও ৭খ (রাষ্ট্রদ্রোহ ও সংবিধানবিরোধী কার্য) আবার আলোচনায় আসবে।
উপসংহার: পরিকল্পনা বনাম সংবিধান
‘I Have a Plan’—এই বাক্য রাজনৈতিক স্লোগান হতে পারে,কিন্তু রাষ্ট্র চলে সংবিধান,আইন ও জবাবদিহিতায়।
তারেক জিয়ার নীরবতা,অতীত রেকর্ড ও বর্তমান কৌশল ইঙ্গিত দিচ্ছে—
এটি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা নয়,
বরং পুরোনো ক্ষমতা দখলের ছক,নতুন নাটকের মঞ্চায়ন।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে এই প্রশ্নে—
পরিকল্পনা বড়,না সংবিধান?












