মাজহারুল ইসলাম।।বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন ও ক্ষমতার লড়াই সবসময়ই জাতীয় সংলাপের মূল ধারা নির্ধারণ করেছে।কিন্তু গত দুই দশক ধরে দেখা গেছে,নির্বাচনের স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত হয়েছে বিরোধী দলের বর্জন,প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে।
২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি হওয়া নির্বাচনই এর প্রাথমিক উদাহরণ।ওই নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৮টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থী নির্বাচিত হন।প্রধান বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করায় আসনগুলোতে বিজয়ী হয়েছিলেন বিএনপি ও তাদের মিত্ররা।পরবর্তীতে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জরুরি অবস্থা জারি করা হয় এবং নির্বাচন বাতিল করা হয়।এটি প্রমাণ করে,ভোটের কার্যকারিতা শুধু ভোটগ্রহণ নয়, বরং রাজনৈতিক পরিবেশ এবং অংশগ্রহণের উপরও নির্ভরশীল।
দুর্নীতির ক্ষেত্রেও বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ধারাবাহিক দ্বন্দ্ব দেখা যায়।টিআই-এর প্রতিবেদনে দেখা যায়,বিএনপি শাসনামলে দেশ টানা পাঁচবার দুর্নীতিতে শীর্ষে ছিল।যদিও বিএনপি অভিযোগ করে পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ শাসনকালের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত ছিল,আন্তর্জাতিক সূচকের দৃষ্টিতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা,বিচারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপই মূল সমস্যা।
২০০৭ সালের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিতর্ক এখনও তাত্পর্যপূর্ণ।বিএনপি মনে করে,ওই সরকার তাদের ধ্বংসের চেষ্টা চালিয়েছে,অন্যদিকে আওয়ামী লীগের পক্ষ দেখায় যে ওই সরকার কিছু দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করেছে, যেমন ভোটার তালিকা সংস্কার।এ থেকে স্পষ্ট হয় যে রাজনৈতিক আন্দোলন ও ক্ষমতার লড়াইয়ে “সত্য” প্রায়শই রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে।
২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করার পেছনে মূল কারণ ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হওয়া।তাদের দাবি ছিল শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারবে না। ২০১৮ সালে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেও দলটি ব্যর্থ হয়। বিএনপির অভিযোগ কারচুপি ও হামলা-প্রতিহিংসার,সরকারের মতে সাংগঠনিক দুর্বলতা ও নেতার অভাব ছিল।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক,২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো অংশগ্রহণ করেনি।আওয়ামী লীগ একতরফা বিজয়ী হলেও আন্তর্জাতিক ও জাতীয়ভাবে রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং ‘ডামি’ প্রার্থীর মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার আড়ম্বর সৃষ্টি করা হলেও ভোটাররা অসন্তুষ্ট।এটি প্রমাণ করে,শক্তিশালী বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে নির্বাচনের প্রভাব ও গণতান্ত্রিক বৈধতা কমে যায়।
বাংলাদেশের রাজনীতি দেখায়,গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ শুধুমাত্র সংবিধান নয়; রাজনৈতিক সহনশীলতা,বিরোধী দলের অংশগ্রহণ,সুষ্ঠু প্রশাসন এবং স্বচ্ছ নির্বাচনই প্রকৃত গণতন্ত্র নিশ্চিত করে।যদি এই চ্যালেঞ্জগুলো অব্যাহত থাকে,ভবিষ্যতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশকে আরও বড় প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে।
সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত: বাংলাদেশের গণতন্ত্র পরীক্ষা চিহ্নিত করছে।একপক্ষের একতরফা বিজয় কিংবা অন্যপক্ষের বর্জন কোনো সমাধান নয়।রাজনৈতিক দলগুলোর সতর্কতা, অংশগ্রহণ এবং স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করতে না পারলে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
![]()

















































সর্বশেষ সংবাদ :———