মাজহারুল ইসলাম।।বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি পুরোনো প্রবণতা বারবার ফিরে আসে—বাস্তবতার চেয়ে স্লোগানকে বড় করে দেখা।যখনই কোনো আঞ্চলিক সহযোগিতা,বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে কোনো অবকাঠামো বা জ্বালানি প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়,তখনই একদল রাজনৈতিক ব্যবসায়ী “দেশ বিক্রি”র অভিযোগ তুলে জনমতকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে।কিন্তু সময়ই শেষ পর্যন্ত সত্যকে সামনে নিয়ে আসে।
ভারতের আসাম রাজ্যের নুমালিগড় থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত তেল পাইপলাইন নির্মাণের সময়ও একই দৃশ্য দেখা গিয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল—এটি নাকি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র।বলা হয়েছিল, “দিল্লির দালালি” চলছে।অথচ আজ যখন জ্বালানি সংকটে দেশের পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন,তখন বাস্তবতা একটাই—সেই পাইপলাইন দিয়েই দ্রুত জ্বালানি দেশে পৌঁছাচ্ছে।অর্থাৎ যেটিকে একসময় রাজনৈতিক অপপ্রচার দিয়ে ‘দেশবিরোধী’ প্রকল্প বলা হয়েছিল,সেটিই এখন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি কার্যকর মাধ্যম।
এখানেই প্রশ্ন উঠে—আসলে কার স্বার্থে এই বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছিল? দেশের, নাকি রাজনীতির বাজার গরম রাখার জন্য?
বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত স্পষ্ট।দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা অনেকাংশেই আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল।ভারত আমাদের প্রতিবেশী—এ বাস্তবতা অস্বীকার করে কোনো রাষ্ট্রনীতি তৈরি করা যায় না। বরং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক উন্নয়নই আধুনিক কূটনীতির নিয়ম।
ইতিহাসের কথাও এখানে স্মরণযোগ্য।১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল ভারত।সেই সময় রাজনৈতিক,সামরিক ও মানবিক সহায়তা ছাড়া স্বাধীনতার সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে উঠত।ইতিহাসের এই সত্য উচ্চারণ করলেই যদি কাউকে “দালাল” বলা হয়,তবে তা আসলে ইতিহাসের প্রতিই অবমাননা।
দুঃখজনকভাবে,স্বাধীনতার ৫০ বছরের বেশি সময় পরেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী রয়েছে যারা পাকিস্তানি মানসিকতার উত্তরাধিকার বহন করে।তাদের কাছে উন্নয়ন নয়,বরং বিভাজনই রাজনীতির মূল হাতিয়ার।তাই তারা দেশের যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প—বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাস্তবায়িত প্রকল্প—নিয়ে সন্দেহ ও বিদ্বেষ ছড়াতে অভ্যস্ত।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে,রাষ্ট্র পরিচালনা আবেগ বা স্লোগান দিয়ে হয় না; হয় স্বার্থ,যুক্তি ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে।জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক সংযোগ বাড়াতে যেসব চুক্তি ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে,সেগুলোকে রাজনৈতিক বিদ্বেষের চশমা দিয়ে দেখলে দেশেরই ক্ষতি হয়।
আজ যখন নুমালিগড়-বাংলাদেশ পাইপলাইন দেশের জ্বালানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে,তখন স্পষ্ট হয়ে গেছে—উন্নয়নকে “দেশ বিক্রি” বলে আখ্যা দেওয়া ছিল নিছক রাজনৈতিক প্রচারণা।
রাষ্ট্রের উন্নয়নকে যদি আমরা সত্যিই অগ্রাধিকার দিতে চাই, তবে স্লোগানের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবতার রাজনীতিতে ফিরতে হবে।কারণ দেশের স্বার্থের প্রশ্নে দিল্লি, ঢাকা বা অন্য কোনো রাজধানী নয়—প্রথম ও শেষ কথা হওয়া উচিত বাংলাদেশের জনগণের কল্যাণ।
![]()
















































সর্বশেষ সংবাদ :———