মাজহারুল ইসলাম।।বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একপাশে নির্বাচনী উত্তেজনা,অন্যদিকে আইনি বাস্তবতা—এই দ্বন্দ্ব আজও শক্তভাবে উপস্থিত।জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান,এবং এই মামলার অপর দুই পলাতক আসামি ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমানকে ধরতে ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করা হয়েছিল।তবে এই উদ্যোগ শুধুমাত্র প্রশাসনিক নয়; এটি আইনি,রাজনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে একাধিক প্রশ্ন তোলে।
ইন্টারপোল নোটিশ: ২০১৩–২০১৮–২০২৬
তারেক রহমানের বিরুদ্ধে প্রথমবার ইন্টারপোল রেড নোটিশ ২০১৩ সালে জারি হয়েছিল।দুই মাসের মধ্যে তা ফ্রান্সের সদর দপ্তর থেকে প্রত্যাহার করা হয়।পরবর্তীতে দেশে বিভিন্ন আদালতে মামলার ফলাফল,উচ্চ আদালতের ৭ বছরের কারাদণ্ড ও ২০ কোটি টাকা জরিমানা,এবং সাম্প্রতিক জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ১০ বছরের দণ্ড—সবই তারেক রহমানকে পলাতক হিসাবে চিহ্নিত করেছে।
২০১৮ সালের প্রেক্ষাপটে রেড নোটিশ কার্যকর হলেও তার বাস্তব প্রভাব সীমিত ছিল।কারণ,তারেক তখন বিদেশে অবস্থান করছিলেন এবং ইন্টারপোলের নীতি অনুযায়ী রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা যায় না।২০২৬ সালে পরিস্থিতি জটিল: তিনি দেশে ফিরেছেন এবং নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয়,তাই রেড নোটিশের বাস্তবায়ন এখন আইনগতভাবে সীমিত,তবে বিদেশে অবস্থানরত অন্য আসামিদের ক্ষেত্রে এখনও কার্যকর হতে পারে।
আইনি বাস্তবতা
বাংলাদেশের আইন স্পষ্ট: পলাতক সাজাপ্রাপ্ত আসামি আদালতে উপস্থিত না হলে কোনো আপিল বা খালাসের অধিকার রাখে না।সুপ্রিম কোর্টের নজির অনুযায়ী,পলাতক আসামির পক্ষে আইনজীবীও মামলা পরিচালনা করতে পারবেন না।
চিকিৎসার জন্য প্যারোলে বিদেশে থাকা এবং রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়াকে আইনগতভাবে ‘জিম্মা থেকে পলায়ন’ হিসেবে গণ্য করা হয়।ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী,দণ্ড কার্যকর হওয়া পর্যন্ত আদালতের জিম্মায় না থাকা পলাতক আসামির জন্য আইনি প্রতিকার অনির্বাচ্য।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
তারেক রহমান বর্তমানে বিএনপির চেয়ারম্যান এবং আসন্ন ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।বিভিন্ন জনমত জরিপে তাকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচনী ইশতেহারে তিনি সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল,কৃষকদের জন্য এগ্রিকালচার কার্ড এবং যোগ্যতা অনুযায়ী নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।এই অবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব ও আইনের সংঘাত আরও স্পষ্ট।
আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের দৃষ্টিভঙ্গি
ইন্টারপোলের রেড নোটিশ সংবিধি অনুযায়ী,রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় হস্তক্ষেপ করা যায় না।তবে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের মতো ফৌজদারি অপরাধে এটি বৈধ। জাতিসংঘের UNCAC কনভেনশন অনুযায়ী,রাষ্ট্রগুলো পলাতক দণ্ডিতদের ফেরত আনতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা করতে বাধ্য।তবে বাস্তবায়ন রাজনৈতিক ও আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে সবসময় পূর্ণ কার্যকর হয় না।
উপসংহার
২০১৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ইন্টারপোল নোটিশ,পলাতক অবস্থান এবং আদালতের রায়—সব মিলিয়ে বাংলাদেশে আইন,রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির সংযোগস্থল তৈরি হয়েছে।
আইনকে এড়িয়ে রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন করা সম্ভব নয়। আদালতে উপস্থিত না হয়ে খালাস পাওয়া,আপিল করা—সবই আইনত অগ্রহণযোগ্য।রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা কেবল তখনই টিকবে,যখন ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাব আইনের বাইরে চলে যাবে না।
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন আইনি স্বচ্ছতা ও নৈতিক দায়িত্বের পরীক্ষায় দাঁড়িয়ে।এই পরীক্ষার সাফল্য নিশ্চিত করবে,যে দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং আইনের শাসন দুইই অটুট থাকবে।
![]()

















সর্বশেষ সংবাদ :———