মাজহারুল ইসলাম।।নির্বাচন সামনে এলেই রাষ্ট্রযন্ত্র যেন হঠাৎ করে সাধারণ মানুষের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে।৯৬ ঘণ্টার জন্য মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনে এক হাজার টাকার বেশি নিষেধাজ্ঞা তারই সর্বশেষ উদাহরণ।কালোটাকা ও অনিয়ম ঠেকানোর নামে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত আসলে কার বিরুদ্ধে—অপরাধীর,না সাধারণ নাগরিকের?
সরকার বলছে,এই বিধিনিষেধ নির্বাচনে অর্থের অপব্যবহার রোধ করবে।প্রশ্ন হলো,বাংলাদেশে কালোটাকার প্রধান প্রবাহ কি সত্যিই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ছোট অঙ্কের লেনদেনের মাধ্যমে হয়? বাস্তবতা বলছে,না।কালোটাকা চলে নগদে, প্রভাবশালীদের হাত ঘুরে,ব্যাংকিং চ্যানেলের ভেতরের ফাঁকফোকর দিয়ে,হুন্ডির মতো অবৈধ পথে।সেখানে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে একজন রোগীর চিকিৎসার টাকা পাঠানো বা পরিবারের প্রয়োজনে অর্থ লেনদেন করা অপরাধ নয়—বরং জীবনযাত্রার অপরিহার্য অংশ।
এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো,এটি জরুরি মানবিক প্রয়োজনকে অগ্রাহ্য করেছে।একজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে মুহূর্তে মুহূর্তে টাকা দরকার হয়—পরীক্ষা,ওষুধ,রক্ত,অপারেশন।বহু পরিবার আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লাখ টাকা পর্যন্ত সংগ্রহ করে জীবন বাঁচায়।নির্বাচনকালীন চার দিন যদি এই পথ বন্ধ থাকে,তার দায় কে নেবে? রাষ্ট্র কি তখন বলবে—নির্বাচন আগে, জীবন পরে?
ডিজিটাল বাংলাদেশ,ক্যাশলেস লেনদেন,আর্থিক অন্তর্ভুক্তি—এই সব স্লোগান বছরের পর বছর শুনিয়ে আসা সরকারই আজ হঠাৎ করে প্রযুক্তিকে সন্দেহের চোখে দেখছে।অপরাধ দমনের অজুহাতে পুরো জনগোষ্ঠীকে শাস্তির আওতায় আনা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে না।অপরাধী শনাক্ত না করে নাগরিকের অধিকার সীমিত করা মানে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা।
নির্বাচন পরিচালনায় নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিও এই সিদ্ধান্ত এক ধরনের অবিশ্বাসের বার্তা দেয়।যেন বলা হচ্ছে—সবাই সন্দেহভাজন। কিন্তু গণতন্ত্র টিকে থাকে বিশ্বাসের ওপর,অবিশ্বাসের ওপর নয়।
কালোটাকা ও পেশিশক্তি রুখতে চাইলে পথ আছে—কঠোর নজরদারি,গোয়েন্দা তৎপরতা,সন্দেহভাজন লেনদেন শনাক্তে প্রযুক্তির ব্যবহার,প্রভাবশালীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এসব না করে মোবাইল ব্যাংকিং বন্ধ করা অনেকটা মাথাব্যথার চিকিৎসায় মাথা কেটে ফেলার মতোই।
নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া জরুরি—এ নিয়ে দ্বিমত নেই।কিন্তু সেই সুষ্ঠুতার মূল্য যদি হয় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ,রোগীর জীবনঝুঁকি ও নাগরিক অধিকার হরণ,তবে সেই নির্বাচন গণতন্ত্রকে শক্ত করে না—বরং জনআস্থাকে আরও দুর্বল করে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব অপরাধ দমন করা,নাগরিকের জীবন অচল করা নয়।সরকারকে এখনই এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে—না হলে ইতিহাস এই পদক্ষেপকে মনে রাখবে জনদুর্ভোগের আরেকটি অপ্রয়োজনীয় অধ্যায় হিসেবে।
![]()






















































সর্বশেষ সংবাদ :———