প্রতিনিধি ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ , ৭:৪৪:৫০ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক:গাজীপুরে তরুণ ও প্রতিশ্রুতিশীল সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।চার্জ গঠনের অল্প সময়ের মধ্যেই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়ায় এটিকে সাংবাদিক সমাজ বিচারিক ব্যবস্থার এক বিরল ও নজিরবিহীন অগ্রগতি হিসেবে দেখছে।

মামলার বাদী ও দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ-এর গাজীপুর জেলা স্টাফ রিপোর্টার,নিহত সাংবাদিক তুহিনের বড় ভাই সেলিমের সাক্ষ্যগ্রহণ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে,সাংবাদিক হত্যা মামলার ইতিহাসে চার্জ গঠনের পর এত দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়া ব্যতিক্রমী ঘটনা। এটি বিচারিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
উল্লেখ্য,গত ৭ আগস্ট গাজীপুরের ব্যস্ততম চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে দুর্বৃত্তরা সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে কুপিয়ে হত্যা করে।ওই নৃশংস ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মামলার বিচারিক অগ্রগতি শুরু হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবার,সহকর্মী এবং সারাদেশের সাংবাদিক সমাজে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
বুধবার দুপুরে প্রধান অভিযুক্ত কেটু মিজান ওরফে কোপা মিজান,তার স্ত্রী গোলাপিসহ মোট আটজন অভিযুক্তকে আদালতে হাজির করা হলে বিচারক আনুষ্ঠানিকভাবে সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম শুরু করেন।
প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী সাক্ষ্যগ্রহণে মামলার বাদী সেলিম ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেন।আইনজীবীদের মতে,এই সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিচারিক লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সূচিত হয়েছে।
সাংবাদিক তুহিনের পক্ষে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত চন্দ্র সরকার বলেন,“চার্জ গঠনের পর এত দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়া অত্যন্ত ইতিবাচক।আমরা ইতোমধ্যে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা স্থানান্তরের আবেদন করেছি। অনুমোদন পেলে পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যেই বিচার সম্পন্ন করা সম্ভব।তবে সরকারি অনুমোদন না পাওয়ায় কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে।”
দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ-এর সম্পাদক এবং সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের প্রধান মো. খায়রুল আলম রফিক বলেন,“গত ৫৪ বছরে দেশে ৬৯ জন সাংবাদিক নিহত হলেও অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি, যা জাতির জন্য লজ্জাজনক। তুহিন হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন হলে এটি একটি ব্যতিক্রমী নজির হয়ে থাকবে।”
তিনি আরও বলেন,“দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিলে ৯০ দিনের মধ্যেই রায় সম্ভব।আমরা আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার আবেদন করেছি।আজ সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়ায় প্রথমবারের মতো মনে হচ্ছে—এই বিচার আমরা সত্যিই দেখতে যাচ্ছি।”
মামলার বাদী সেলিম বলেন,“দ্রুত বিচার চেয়ে দীর্ঘদিন ধরে আবেদন করেছি।আজ দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষ্যগ্রহণ হওয়ায় আমাদের পরিবারের জন্য এটি বড় স্বস্তির বিষয়।আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি।”
সাংবাদিক নেতারা মনে করেন,এই মামলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হলে বাংলাদেশে সাংবাদিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই দেশজুড়ে কালো ব্যাজ ধারণ,মানববন্ধন,প্রেস ক্লাব কর্মসূচি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবাদ গড়ে ওঠে। তখন একটাই স্লোগান উচ্চারিত হয়—
“তুহিন হত্যার বিচার চাই,দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।”
বিশেষজ্ঞদের মতে,তুহিন শুধু একজন সাংবাদিকই ছিলেন না—তিনি ছিলেন সত্যের কণ্ঠস্বর।তার হত্যা ছিল সাংবাদিকতা, সমাজ ও গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আঘাত।বিচার বিলম্বিত হলে সেই ক্ষত আরও গভীর হতো।
চার্জ গঠন,দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণ এবং ধারাবাহিক শুনানির মাধ্যমে এই মামলার অগ্রগতি একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যা আর ধামাচাপা দেওয়া যাবে না।
সাংবাদিক মহলের দৃঢ় বিশ্বাস,তুহিন হত্যার বিচার কার্যকরভাবে সম্পন্ন হলে এটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে।
প্রশ্ন এখন একটাই—রাষ্ট্র কি এবার সত্যিই প্রমাণ করবে, সত্যের কণ্ঠ কখনো রুদ্ধ করা যায় না?












