প্রতিনিধি ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ , ৭:৩৫:০৫ প্রিন্ট সংস্করণ
মাজহারুল ইসলাম।।দেশে সরকার বদলেছে,ক্ষমতার কাঠামো পাল্টেছে,কিন্তু মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে দিচ্ছে—আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কোনো ধারণা নয়,এটি একটি প্রমাণিত বাস্তবতা।

পুলিশ সদর দফতরের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী,২০২১ সালে দেশে হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছিল ৩ হাজার ২১৪টি। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ১২৬টিতে,২০২৩ সালে ছিল ৩ হাজার ২৩টি।কিন্তু ২০২৪ সালে আবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪৩২টিতে।অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতির টানাপোড়েনের মধ্যেই হত্যাকাণ্ড নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল—আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র।আগস্ট থেকে ডিসেম্বর—মাত্র পাঁচ মাসে থানাগুলোতে হত্যা মামলা হয়েছে ১ হাজার ৫৭৩টি।শুধু আগস্ট মাসেই মামলা হয়েছে ৬২৬টি। যদিও এর মধ্যে ১৫৮টি মামলা আগের বছরগুলোর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নতুন করে দায়ের হয়েছে,তবু এই তথ্য চলমান সহিংসতার ভয়াবহতাকে অস্বীকার করে না।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো—২০২৫ সালেও পুরোনো ও নতুন হত্যাকাণ্ড মিলিয়ে মামলা নথিভুক্ত হওয়ার ধারা অব্যাহত রয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ৩০০টি হত্যা মামলার মধ্যে ২৪টি,মার্চে ২৯টি এবং এপ্রিলে ১৯টি মামলা এসেছে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়।সব মিলিয়ে ৫ আগস্টের পর এখন পর্যন্ত ২৩০টি পুরোনো হত্যাকাণ্ডের মামলা নতুন করে আইনি প্রক্রিয়ায় এসেছে।এটি একদিকে বিচারহীনতার দীর্ঘ ইতিহাসের প্রমাণ,অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি মানুষের দীর্ঘদিনের অনাস্থারও প্রতিফলন।
তবে পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতা আরও নির্মম।প্রতিদিনই নতুন নতুন হত্যাকাণ্ড ঘটছে—ব্যক্তিগত শত্রুতা, আধিপত্য বিস্তার,রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে।বিশেষজ্ঞদের মতে,আইনের প্রয়োগ দুর্বল হওয়ায় অপরাধীদের মধ্যে স্পষ্টভাবে দায়মুক্তির মানসিকতা তৈরি হয়েছে। তারা বিশ্বাস করছে—অপরাধ করেও পার পাওয়া যাবে।
সামনে জাতীয় নির্বাচন। অতীত অভিজ্ঞতা বলে,এই সময় রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়ে যায়। হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান যদি এখনই লাগামহীন থাকে,তবে নির্বাচনকালীন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা অমূলক নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘সতর্ক অবস্থান’ বা ‘নিয়মিত অভিযান’ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান, কঠোর ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা।
রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব নাগরিকের জীবন রক্ষা করা।উন্নয়ন, সংস্কার কিংবা নির্বাচন—সব কিছুর ভিত্তি নিরাপত্তা। খুনের পরিসংখ্যান যদি বছরের পর বছর একই জায়গায় ঘুরপাক খায় বা বাড়তে থাকে,তবে সেটি কেবল আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয়,রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতারও প্রশ্ন তোলে।
এখনই যদি দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভাঙা না যায়,অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত না করা হয়,তবে এই পরিসংখ্যান আরও দীর্ঘ হবে—আর তার মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকে।রাষ্ট্র কি সেই দায় নেবে?

















