প্রতিনিধি ১১ জানুয়ারি ২০২৬ , ৩:৫৫:৫৭ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক।।২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে—যা ‘এক-এগারো’ নামে পরিচিত। তৎকালীন রাজনৈতিক অচলাবস্থা,সহিংস আন্দোলন ও নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে।এই সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া ও নেপথ্যের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সময়ের ব্যবধানে নানা তথ্য সামনে এসেছে।

বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তৎকালীন অন্যতম উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন জানান,নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের আগে তাকে গোপনে ডাকা হয়েছিল।তার ভাষায়,“আমার কাছে লোক পাঠানো হয়েছিল।বলা হয়েছিল—আপনি আসেন,কেউ জানবে না।সেই অনুযায়ী আমি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যাই।সেখানে দেখি সামরিক বাহিনীর বড় বড় কর্মকর্তারা উপস্থিত।” তিনি জানান,সেখানে প্রায় ১৫ থেকে ২০ জনের মতো ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন।
ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের ধারণা ছিল,হয়তো দেশে সামরিক শাসন জারি হতে যাচ্ছে।সে বৈঠকে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন এবং তাকে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারে যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান।তবে মইনুল হোসেন সরাসরি সরকারে যোগ না দিয়ে বাইরে থেকে সহায়তা করার প্রস্তাব দেন।যুক্তি হিসেবে তিনি সরকার পরিচালনায় নিজের অনভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সেনা কর্মকর্তারা তাকে ৪৮ ঘণ্টা সময় দেন।
পরবর্তীতে ৪৮ ঘণ্টা পর তার সঙ্গে আবার যোগাযোগ করা হয়।এর মধ্যেই তিনি জানতে পারেন যে ড. ফখরুদ্দিন আহমেদকে প্রধান উপদেষ্টা করা হচ্ছে। “আমি ভাবলাম, ফখরুদ্দিন সাহেব থাকলে পরিস্থিতি সামলানো সম্ভব হতে পারে।আমি তার সঙ্গে কথা বলি।তিনি বলেন,তুমি এলে ভালো হবে।এরপরই আমি রাজি হই,”—বলেন মইনুল হোসেন।
ড. ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা,জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক জোটের নেতারা।সে সময় শেখ হাসিনা এ সরকারকে আওয়ামী লীগের আন্দোলনের ফসল বলেও উল্লেখ করেছিলেন।
তবে সরকার গঠনের কিছুদিন পরই পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।বিএনপির পাশাপাশি শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়।আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিমের ভাষ্য অনুযায়ী,“শুরুতে ভালো কথা বলা হলেও পরে সরকারের উদ্দেশ্য পাল্টে যায়।”
এক পর্যায়ে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়—এমন অভিযোগও উঠে আসে।শুধু রাজনীতিবিদ নয়,শীর্ষস্থানীয় বহু ব্যবসায়ীকেও আটক করা হয়।সংবাদমাধ্যমের ওপর আরোপ করা হয় কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ।
এদিকে দেশে একটি গ্রহণযোগ্য সাধারণ নির্বাচনের দাবিতে দেশি-বিদেশি চাপ বাড়তে থাকে।শেষ পর্যন্ত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করে।ওই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই প্রায় দুই বছর পর দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু হয়।
এক-এগারোর সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অনেকেই সংকটকাল হিসেবে দেখেন।জেনারেল মইন ইউ আহমেদ তার স্মৃতিকথায় ওই সময়ের পরিস্থিতিকে ‘গৃহযুদ্ধের আশঙ্কাজনক অবস্থা’ হিসেবেও বর্ণনা করেছেন।আজও এক-এগারো বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি আলোচিত ও বিশ্লেষণযোগ্য অধ্যায় হয়ে আছে।
















