ইসলাম ও জীবন

ইসলামী ব্যাংকের ‘মুনাফা’ গ্রহণ কতটা শরীয়াসম্মত? কুরআন-হাদীসের আলোকে বিশ্লেষণ

  প্রতিনিধি ১০ জানুয়ারি ২০২৬ , ১:১৫:২৭ প্রিন্ট সংস্করণ

ইসলামী ব্যাংকের ‘মুনাফা’ গ্রহণ কতটা শরীয়াসম্মত? কুরআন-হাদীসের আলোকে বিশ্লেষণ

ডেস্ক রিপোর্ট ঢাকা:বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ‘ইসলামী ব্যাংকিং’ নামে পরিচালিত বিভিন্ন ব্যাংকে আমানত রেখে মাসিক বা মেয়াদী ‘মুনাফা’ গ্রহণ শরীয়াহসম্মত কি না—এ নিয়ে আলেম সমাজে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। শরীয়াহ বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মতে,প্রচলিত ইসলামী ব্যাংকগুলোর অধিকাংশ বিনিয়োগ কার্যক্রম কাগজে-কলমে ইসলামী হলেও বাস্তবে পূর্ণাঙ্গ শরীয়াহ মানদণ্ড বজায় রাখা হচ্ছে না।ফলে এসব ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথাকথিত ‘মুনাফা’ মূলত সুদের সমতুল্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

কুরআনের নির্দেশনা

পবিত্র কুরআনে সুদ (রিবা) সম্পর্কে কঠোর সতর্কতা প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—> “আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)

আরও বলা হয়েছে—> “হে ঈমানদারগণ!তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং যদি তোমরা প্রকৃত মুমিন হও,তবে সুদের যা অবশিষ্ট আছে তা পরিত্যাগ করো।” (সূরা আল-বাকারা: ২৭৮)

শরীয়াহ আলেমদের মতে,ব্যাংকে নির্দিষ্ট হারে বা প্রায় নিশ্চিতভাবে যে অর্থ বাড়তি হিসেবে ফেরত আসে,তা প্রকৃত ব্যবসায়িক ঝুঁকিভিত্তিক লাভ নয়; বরং এটি সুদের সংজ্ঞার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

হাদীসের আলোকে সুদের ভয়াবহতা

রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদের ব্যাপারে কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন। সহিহ হাদীসে এসেছে—

> “সুদ গ্রহণকারী,সুদ প্রদানকারী, সুদের লেখক ও সাক্ষী—এদের সবাইকে রাসূলুল্লাহ ﷺ অভিশাপ দিয়েছেন এবং বলেছেন, তারা সবাই সমান (গুনাহে)।” (সহিহ মুসলিম: ১৫৯৮)

অন্য হাদীসে রাসূল ﷺ বলেন—

> “এক দিরহাম সুদ,যা মানুষ জেনে-বুঝে গ্রহণ করে,তা ছত্রিশ বার ব্যভিচারের চেয়েও ভয়াবহ।” (মুসনাদ আহমদ)

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বাস্তবতা

শরীয়াহ বিশ্লেষকদের মতে,প্রকৃত ইসলামী বিনিয়োগে ‘মুদারাবা’, ‘মুশারাকা’, ‘ইজারা’ ইত্যাদি পদ্ধতিতে লাভ-লোকসানের ঝুঁকি উভয় পক্ষকে বহন করতে হয়।কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ ইসলামী ব্যাংকে ডিপিএস,এফডিআর বা সেভিংস অ্যাকাউন্টে প্রায় নিশ্চিত হারে ‘মুনাফা’ ঘোষণা করা হয়,যা বাস্তবে ঝুঁকিমুক্ত নির্দিষ্ট আয়ের নিশ্চয়তা দেয়। এটি শরীয়াহর দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।

এ কারণে শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়,মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (যেমন—বিকাশ) বা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানতের বিপরীতে যে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া হয়,সেটিও একই আপত্তির আওতায় পড়ে বলে আলেমরা মত দেন।

কোনটি জায়েজ,কোনটি নয়

আলেমদের শরীয়াহিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী—

কারেন্ট অ্যাকাউন্ট: প্রয়োজনের জন্য টাকা রাখা জায়েজ, কারণ এতে কোনো মুনাফা বা সুদ দেওয়া হয় না।

সেভিংস অ্যাকাউন্ট ও ফিক্সড ডিপোজিট (ডিপিএস/এফডিআর): এতে টাকা রেখে মুনাফা গ্রহণ জায়েজ নয়, কারণ তা সুদের অন্তর্ভুক্ত।

লকার সার্ভিস: মূল্যবান জিনিস সংরক্ষণের সেবা হিসেবে এটি সম্পূর্ণ জায়েজ।

অনিচ্ছাকৃত মুনাফার ক্ষেত্রে করণীয়

যদি কেউ অজ্ঞতাবশত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে ব্যাংকে টাকা রেখে মুনাফা পেয়ে থাকেন,তবে শরীয়াহ মতে মূল টাকা ব্যবহার করা বৈধ।তবে অতিরিক্ত যে অর্থ এসেছে,তা নিজের ভোগে না এনে দান বা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা উত্তম।

উপসংহার

শরীয়াহ বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো—বর্তমান বাস্তবতায় ইসলামী ব্যাংকিংয়ের নামে প্রদত্ত ‘মুনাফা’ গ্রহণ করা নিরাপদ নয়।কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী হালাল-হারামের প্রশ্নে সতর্কতা অবলম্বন করাই মুমিনের জন্য শ্রেয়।

সূত্র: বাদায়েউস সানায়ে ৪/৪২৬; আল-মাআয়ীরুশ শরইয়্যাহ, পৃ. ১৫৬, ২১০–২১৬, ২৪২–২৫৫; মাজাল্লাতু মাজমাইল ফিকহিল ইসলামী, সংখ্যা ৫ (২/১৫৩৯, ১৫৯৯) ও সংখ্যা ১২ (১/৬৯৭)

তথ্যসূত্র প্রদান: ফতওয়া বিভাগ,মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া,ঢাকা

আরও খবর

Sponsered content