অপরাধ-আইন-আদালত

এবার বসুন্ধরার গণমাধ্যম পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি জুলাই আন্দোলনকারীদের

  প্রতিনিধি ৯ জানুয়ারি ২০২৬ , ১২:২৭:৩৯ প্রিন্ট সংস্করণ

এবার বসুন্ধরার গণমাধ্যম পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি জুলাই আন্দোলনকারীদের

ডেস্ক রিপোর্ট।।প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের পর এবার বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন গণমাধ্যমগুলো পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন জুলাই আন্দোলনের একাংশ।বুধবার (৭ জানুয়ারি) ঢাকার শাহবাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই হুমকি দেন কথিত ‘শিশু জুলাই আন্দোলনকারী’ তাহরিমা জান্নাত সুরভী।

এর আগে একটি চাঁদাবাজির মামলায় সোমবার (৫ জানুয়ারি) গাজীপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত–২ শুনানি শেষে তাহরিমা জান্নাত সুরভীর দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।তবে ওই দিনই জুলাই আন্দোলনের ব্যানারে সংঘবদ্ধ একদল লোক মব সৃষ্টি করে তাকে কারাগার থেকে বের করে নিয়ে আসে বলে অভিযোগ ওঠে।

সুরভীকে অপ্রাপ্তবয়স্ক দাবি করে তার গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের প্রতিবাদে আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেন জুলাই আন্দোলনের নেতাকর্মীরা।পরে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর ঢাবির মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বসুন্ধরা গ্রুপ ও সিটি গ্রুপের মালিকানাধীন গণমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং ‘প্রথম আলোর মতো অফিস পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া হবে’ বলে প্রকাশ্য হুমকি দেন।

এদিকে চ্যানেল টোয়েন্টিফোর তাহরিমা জান্নাত সুরভীর জামিন প্রসঙ্গে শিরোনাম দেয়— “দুপুরে রিমান্ড,বিকেলে জামিন, সন্ধ্যায় মুক্তি”। জামিনে মুক্তি পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রকাশ্যে গণমাধ্যমে অগ্নিসংযোগের হুমকি আসায় বিষয়টি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে,এই ঘটনা দেশের সংবাদমাধ্যমের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।বিশেষ করে ২০২৫ সালে সাংবাদিকদের জন্য পরিস্থিতি ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ।মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)–এর ২০২৫ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে,জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের ওপর হয়রানি,নির্যাতন ও নিপীড়নের অন্তত ৩৮১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী,এসব ঘটনার মধ্যে ২৩টিতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে।এ ছাড়া অন্তত ২০ জন সাংবাদিক প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন এবং ১২৩ জন সাংবাদিক পেশাগত কাজের প্রতিশোধ হিসেবে দায়ের করা বিভিন্ন ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হয়েছেন।

২০২৫ সালে সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক সহিংসতাও ছিল উদ্বেগজনক মাত্রায়। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ব্যবহার সাংবাদিক গ্রেপ্তার ও আটক করার একটি দমনমূলক কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।এই প্রেক্ষাপটে সাংবাদিক মনজুরুল আলম পান্না ও আনিস আলমগীরের গ্রেপ্তার ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।আনিস আলমগীর এখনও কারাবন্দী রয়েছেন।

এ ছাড়া দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী জনতার ভাঙচুর,লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। শুধু হামলাই নয়,সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ এবং সংবাদ প্রকাশে নিয়ন্ত্রণ আরোপের অভিযোগও সামনে এসেছে।

সম্প্রচার মাধ্যমগুলোর ওপর চাপ আরও বেড়ে যায় যখন ‘জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স (জেএ)’ নামের একটি গোষ্ঠী তিনটি টেলিভিশন চ্যানেলের কার্যালয় ঘেরাওয়ের হুমকি দেয়।এর পরিপ্রেক্ষিতে অন্তত তিনজন ব্রডকাস্ট সাংবাদিক চাকরি হারান।সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ,সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীকে প্রশ্ন করাই ছিল তাদের ‘অপরাধ’।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী,এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়।২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের সহিংসতা সংক্রান্ত বিতর্কিত মামলায় গ্রেপ্তার সাংবাদিক ফারজানা রূপা,শাকিল আহমেদ,মোজাম্মেল বাবু ও শ্যামল দত্ত ২০২৫ সালজুড়েই কারাবন্দী ছিলেন।পাশাপাশি শত শত সাংবাদিক এমন মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন,যেগুলোকে মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা হচ্ছে।

সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষকদের মত,২০২৫ সালের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার এক গভীর সংকটের চিত্র তুলে ধরছে—যেখানে স্বাধীন সাংবাদিকতাকে গণতন্ত্রের অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে নয়,বরং ক্ষমতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আরও খবর

Sponsered content