প্রতিনিধি ৮ জানুয়ারি ২০২৬ , ৩:৪৭:১৯ প্রিন্ট সংস্করণ
মাজহারুল ইসলাম।।কারাগার সভ্য রাষ্ট্রে শাস্তি কার্যকরের স্থান—প্রতিশোধ,নির্যাতন বা গোপন হত্যার ক্ষেত্র নয়।অথচ হাজতি তারিকুল ইসলামের কারাগার থেকে পাঠানো চিঠি এবং ‘স্লো পয়জন’ দিয়ে রাজনৈতিক বন্দীদের হত্যার অভিযোগ একত্রে এমন এক ভয়াবহ বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে,যা উপেক্ষা করলে রাষ্ট্র নিজেই অভিযুক্তের কাঠগড়ায় দাঁড়াবে।

তারিকুল ইসলামের অভিযোগ কোনো বিচ্ছিন্ন আর্তনাদ নয়। এটি একটি ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার প্রতীক।শারীরিক নির্যাতন, চিকিৎসা বঞ্চনা ও প্রশাসনিক হয়রানির অভিযোগ যদি সত্য হয়—তবে তা সংবিধানের ৩১ ও ৩৫ অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন।আর যদি মিথ্যা হয়—তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল তা দ্রুত প্রমাণ করা।কিন্তু বাস্তবতা হলো,রাষ্ট্র কোনো দিকেই হাঁটেনি। এই নীরবতাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
এর মধ্যেই উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ অভিযোগ—কারাগারে ‘স্লো পয়জন’ প্রয়োগ করে ৮৫ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে হত্যার অভিযোগ এবং ভবিষ্যতে প্রায় ৯২ হাজার বন্দীকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞের আশঙ্কা।এ দাবি সত্য হলে এটি নিছক মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়;এটি রাষ্ট্রীয় অপরাধ,আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় ক্রাইম এগেইনস্ট হিউম্যানিটি।এমন অভিযোগের পরও যদি রাষ্ট্র নির্বিকার থাকে, তবে সেটি আর অদক্ষতা নয়—দায়সারা সহমত।
কারা প্রশাসন বারবার বলে থাকে,‘কারাগারে সবকিছু নিয়ম মেনেই হয়’।প্রশ্ন হলো—তবে নিয়মের নজরদারি করে কে? যখন একই কারাগারে বারবার অসুস্থতা,মৃত্যু ও নির্যাতনের অভিযোগ আসে,তখন তদন্ত না করাই কি নিয়ম?নাকি নিয়মটাই এমনভাবে বানানো হয়েছে,যাতে অপরাধ ধামাচাপা পড়ে?
জাতিসংঘের Mandela Rules স্পষ্ট করে বলে—বন্দীর জীবন ও চিকিৎসার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।সেখানে কোনো ‘কিন্তু’ নেই, কোনো রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও নেই।বন্দী যে দলেরই হোক, সে রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা একজন নাগরিক।তার ওপর নির্যাতন মানে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যর্থতা।
আজ সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো—এই অভিযোগগুলো যদি সত্য হয় এবং এখনই কঠোর ও স্বাধীন তদন্ত না হয়,তবে ভবিষ্যতে কারাগারে প্রতিটি মৃত্যু ‘স্বাভাবিক’ বলে চালিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি পাকাপোক্ত হবে।আর যদি অভিযোগগুলো মিথ্যা হয়,তবুও তদন্ত ছাড়া তা প্রমাণ না হলে সমাজে ভয়, গুজব ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আরও গভীর হবে।
সুতরাং রাষ্ট্রের সামনে এখন মাত্র একটি পথ খোলা—তা হলো অবিলম্বে স্বাধীন বিচারিক তদন্ত,ফরেনসিক অডিট এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে কারাগার পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা। অন্যথায় ইতিহাস একদিন প্রশ্ন তুলবে—কারাগারে মানুষ মরছিল,আর রাষ্ট্র তখন কী করছিল?
এই সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে কারাগারের ভয়ংকর অতিরিক্ত ভিড়।বর্তমানে দেশের ৬৮টি কারাগারে যেখানে মোট ধারণক্ষমতা মাত্র ৪২,৬৮৮ জন,সেখানে বন্দী রয়েছেন ৮৭,৮১২ জন—অর্থাৎ ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি। ঢাকা বিভাগে ১৩,৪২১ জনের জায়গায় বন্দী ৩০,৮১১ জন, চট্টগ্রামে ৬,৯৫০-এর বিপরীতে ১৭,২৩৫ জন এবং রাজশাহীতে ৪,১৭৯ জনের স্থলে ১৩,৫৯৮ জন—প্রায় তিন গুণ।এমন অমানবিক ভিড়ে স্বাস্থ্যসেবা,পুষ্টিকর খাবার,বিশুদ্ধ পানি ও ন্যূনতম মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা কার্যত অসম্ভব।
এই অতিরিক্ত চাপ কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতার চিত্র নয়; এটি নির্যাতন,অবহেলা ও রহস্যজনক মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ভিড়ের অজুহাতে চিকিৎসা বিলম্ব,অসুস্থতা উপেক্ষা কিংবা মৃত্যুকে ‘স্বাভাবিক’ বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা মানবাধিকার লঙ্ঘনের নতুন স্বাভাবিকতায় পরিণত হচ্ছে। সিলেট বিভাগে তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক অবস্থা প্রমাণ করে—চাপ কমলে ব্যবস্থাপনা সম্ভব; অর্থাৎ সমস্যাটি অনিবার্য নয়,এটি নীতিগত ব্যর্থতার ফল।
কারাগার যদি সত্যিই নীরব হত্যাকেন্দ্রে পরিণত হয়ে থাকে, তবে সেটি শুধু বন্দীদের নয়—সমগ্র রাষ্ট্রের জন্যই অশনিসংকেত।















