প্রতিনিধি ৮ জানুয়ারি ২০২৬ , ৯:১৩:২৭ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক।।একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট শুনতে বুধবার (৭ জানুয়ারি) অপারগতা প্রকাশ করেছে হাইকোর্ট।বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রিটটি শুনতে অস্বীকৃতি জানান।পরবর্তীতে রিট আবেদনকারী আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ আবেদনটি বিচারপতি রাজিক আল জলিলের নেতৃত্বাধীন অন্য একটি হাইকোর্ট বেঞ্চে উপস্থাপন করেন।

রিটের মূল বক্তব্য
গত ৫ জানুয়ারি দায়ের করা রিটে বলা হয়,
একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণায় সংবিধানিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে
বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজন আইনসম্মত নয়
তফসিলের কার্যকারিতা স্থগিত করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের মাধ্যমে নতুন নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে
রিটে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিবাদী করা হয়েছে।
আইনজীবীর বক্তব্য
আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ বলেন,
> “বাংলাদেশের সংবিধানে ‘অন্তর্বর্তী সরকার’ নামে কোনো কাঠামো নেই।সুতরাং এই ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন সাংবিধানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।নির্বাচন হতে পারে কেবল নির্বাচিত সরকার অথবা সংবিধানসম্মত তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার অধীনে।”
⚖️ আইনি বিশ্লেষণ
১. সংবিধানিক প্রশ্ন
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭: সংবিধানই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন
অনুচ্ছেদ ১১৯ ও ১২৩: নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ও তফসিল ঘোষণার এখতিয়ার
একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন করলে ভোটারদের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার (অনুচ্ছেদ ৩৭ ও ৩৮) বাধাগ্রস্ত হতে পারে
২. গণভোট ও নির্বাচন একসাথে
গণভোট একটি নীতিগত ও সংবিধান সংশোধনী সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত,আর জাতীয় নির্বাচন হলো প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।
দুটি ভিন্ন উদ্দেশ্যের ভোট একসাথে হলে—
ভোটার বিভ্রান্তি
প্রশাসনিক পক্ষপাত
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঝুঁকি
বাড়তে পারে,যা Representation of the People Order (RPO),1972-এর উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
🧑⚖️ মানবাধিকার দৃষ্টিভঙ্গি
১. ভোটাধিকার
সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা (UDHR),অনুচ্ছেদ ২১ অনুযায়ী—
> জনগণের ইচ্ছাই সরকারের বৈধতার ভিত্তি।
একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন করলে ভোটারদের স্বাধীন ও অবাধ মত প্রকাশ প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে,যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
২. ন্যায়বিচার ও আইনি প্রতিকার
হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রিট শুনতে অপারগতা জানালেও তা বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ,তবে দ্রুত অন্য বেঞ্চে শুনানি না হলে—
ন্যায়বিচার বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা
জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি
থাকে।
🏛️ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
এই রিট এমন সময়ে দায়ের হয়েছে যখন—
নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র
বিরোধী দলগুলো নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক চলছে
আদালতের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বা অস্থিরতা—দুটির যেকোনো একটির দিকে দেশকে ঠেলে দিতে পারে।
🌍 আন্তর্জাতিক ও নিরাপত্তা প্রেক্ষাপট
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে—
জাতিসংঘ,ইউরোপীয় ইউনিয়ন,যুক্তরাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ওপর গুরুত্ব দেয়
বিতর্কিত নির্বাচন হলে
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সীমিত হতে পারে
নিষেধাজ্ঞা বা কূটনৈতিক চাপ বাড়তে পারে
অভ্যন্তরীণভাবে—
নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি
জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
💰 অর্থনৈতিক প্রভাব
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বিদেশি বিনিয়োগ স্থবির হতে পারে
রপ্তানি খাতে বাণিজ্যিক ঝুঁকি বাড়তে পারে
নির্বাচন ও গণভোট একসাথে হলে রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমার যুক্তি থাকলেও,আইনগত বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে অর্থনৈতিক ক্ষতি বহুগুণে বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতো সংস্থাগুলো গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতাকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করে।
উপসংহার
একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের প্রশ্নটি কেবল একটি আইনি বিতর্ক নয়; এটি—
গণতন্ত্র
মানবাধিকার
রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা
আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা
অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ
এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এই বিষয়ে একটি আইনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে,যা ভবিষ্যতের নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য দিকনির্দেশক হবে।নির্বাচনের বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে সংবিধান,আইন ও মানবাধিকারের সমন্বিত প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি।
















