প্রতিনিধি ২ জানুয়ারি ২০২৬ , ৯:৫৫:৩১ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক।।এটি দুর্ঘটনা নয়,এটি রাষ্ট্রের চোখের সামনে সংঘটিত গণহত্যা।গাজী টায়ারসের ছয়তলা ভবনে আগুন লাগার ঘটনা কোনো শিল্প দুর্ঘটনা নয়,কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত অগ্নিকাণ্ড নয়—এটি ছিল একটি পরিকল্পিত গণহত্যা,যার দায় শুধু দুষ্কৃতকারীদের নয়,বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরের ওপর বর্তায়।টানা পাঁচ দিন ধরে একটি ভবন জ্বলেছে,আর তার ভেতরে অন্তত ১৮২ জন মানুষ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে—এমন ভয়াবহ ঘটনার পরও আজ পর্যন্ত একটি হত্যা মামলাও হয়নি,একজন আসামিকেও গ্রেপ্তার করা হয়নি। এটি নিছক ব্যর্থতা নয়; এটি একটি সচেতন অপরাধমূলক নীরবতা।

১. তদন্ত রিপোর্ট: দুর্ঘটনার গল্প রাষ্ট্র নিজেই মিথ্যা প্রমাণ করেছে
তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পরিষ্কারভাবে বলছে—এটি স্বতঃস্ফূর্ত নয়।
মসজিদ থেকে মাইকে পরিকল্পিতভাবে লোক ডাকা হয়েছে
প্রথম ঘোষণা: তথাকথিত জমি দখলদারদের জড়ো হতে বলা
দ্বিতীয় ঘোষণা: ‘ডাকাত ঢুকেছে’—মব উসকে দেওয়ার জন্য সম্পূর্ণ মিথ্যা বার্তা
এরপর শুরু হয় লুটপাট,অগ্নিসংযোগ ও হত্যাযজ্ঞ
এগুলো দুর্ঘটনার লক্ষণ নয়,এগুলো সংগঠিত সহিংসতার স্পষ্ট আলামত।প্রশ্ন হলো—এই ঘোষণা কার নির্দেশে,কার স্বার্থে, কার আশ্রয়ে?
২. আইনি বিশ্লেষণ: মামলা না হওয়াটাই সবচেয়ে বড় অপরাধ
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি অনুযায়ী এটি:
৩০২ ধারা: গণহত্যা
৪৩৬/৪৩৮ ধারা: অগ্নিসংযোগ করে মানুষ হত্যা
২০১ ধারা: প্রমাণ ধ্বংস
৩৪ ধারা: সংঘবদ্ধ অপরাধ
১৮২টি মৃত্যুর পরও যদি মামলা না হয়,তবে প্রশ্ন ওঠে—আইন কি কেবল দুর্বলদের জন্য? ভবনটিকে ‘পরিত্যক্ত’ ঘোষণা করে সেখানে কাউকে ঢুকতে না দেওয়া হয়েছে।লাশ উদ্ধার হয়নি,ফরেনসিক হয়নি,ডিএনএ টেস্ট হয়নি।এটি নিছক অবহেলা নয়—এটি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রমাণ লোপাটের অপচেষ্টা।
৩. বিচারিক বিপর্যয়: আদালত,প্রসিকিউশন ও রাষ্ট্র—সবাই নীরব
এই দেশে একটি মৃত্যুও যদি অস্বাভাবিক হয়,আদালত নড়েচড়ে বসে।অথচ এখানে ১৮২ জন মানুষ পুড়ে মরল, আর বিচার বিভাগ কার্যত দর্শকের ভূমিকায়।
কোনো বিচার বিভাগীয় তদন্ত হয়নি
কোনো বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়নি
প্রসিকিউশন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়
এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়—এটি বিচার বিভাগের অস্তিত্বের প্রশ্ন।
৪. নিরাপত্তা বিশ্লেষণ: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুপস্থিতি কি আদেশপ্রাপ্ত?
দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত একটি শিল্পাঞ্চলে আগুন, লুটপাট ও হত্যাযজ্ঞ চলেছে।
পুলিশ যায়নি
র্যাব যায়নি
সেনা মোতায়েন হয়নি
এটি অক্ষমতা হলে তদন্ত দরকার,আর যদি নির্দেশনা থাকে—তবে এটি রাষ্ট্রদ্রোহের সমান অপরাধ।একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের পুড়ে মরতে দিয়ে যদি দাঁড়িয়ে থাকে,তবে সেই রাষ্ট্র তার নৈতিক বৈধতা হারায়।
৫. রাজনৈতিক দায়: মব দিয়ে ক্ষমতায় এসে মবেই বন্দী
যে সরকার ‘শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার’ নামে ক্ষমতায় এসেছে, তাদের আমলেই:
১২৪৩টি কারখানায় হামলা
শিল্পাঞ্চল মবের দখলে
মতিঝিল,গুলশান,বারিধারা—সবখানে অনিরাপত্তা
যে মব দিয়ে ক্ষমতার পথ পরিষ্কার করা হয়েছে,সেই মবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস সরকারের নেই। ফলে সরকার আজ নিজেই মবের জিম্মি।
৬. অর্থনৈতিক ধ্বংসযজ্ঞ: বিনিয়োগ পালাচ্ছে,শিল্প মরছে
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো আর রাখঢাক করছে না।
বিনিয়োগ বন্ধ
ব্যবসায়িক আস্থা ভেঙে পড়েছে
শিল্পকারখানা বন্ধের পথে
গাজী টায়ারসের আগুন শুধু একটি ভবন পোড়ায়নি—এটি বাংলাদেশের শিল্পখাতের ভবিষ্যত পুড়িয়ে দিয়েছে।
৭. সামাজিক বিপর্যয়: লাশহীন মৃত্যু, রাষ্ট্রহীন নাগরিক
১৮২টি পরিবার আজও:
লাশ পায়নি
কবর দিতে পারেনি
মৃত্যুসনদ পায়নি
এটি শুধু শোক নয়—এটি রাষ্ট্র কর্তৃক নাগরিকদের অস্বীকৃতি।
৮. আন্তর্জাতিক ভণ্ডামি: মানবাধিকারের বুলি,বাস্তবে নীরবতা
যারা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা বলে এই সরকারকে সমর্থন দিয়েছে,তারা আজ নীরব।
কোনো আন্তর্জাতিক তদন্ত নেই
কোনো চাপ নেই
এই নীরবতা প্রমাণ করে—মানবাধিকার তাদের কাছে নীতির বিষয় নয়,স্বার্থের বিষয়।
উপসংহার: বিচার না হলে রাষ্ট্রই অপরাধী।১৮২ জন মানুষ পুড়ে মরেছে।তাদের কোনো নাম নেই,কোনো কবর নেই, কোনো মামলা নেই।যে রাষ্ট্র এই হত্যার বিচার করতে পারে না—or করতে চায় না—সে রাষ্ট্র নিজেই ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াবে।
আজ প্রশ্ন একটাই: এই ১৮২ জনের বিচার কাদের কাছে চাইব,যখন রাষ্ট্রই অভিযুক্ত?















