প্রতিনিধি ১ জানুয়ারি ২০২৬ , ২:১০:৫৮ প্রিন্ট সংস্করণ
ডেস্ক রিপোর্ট।।রাজনীতির ইতিহাসে নেতার নাম, আন্দোলন ও ক্ষমতার গল্প সামনে আসে বেশি।তবে সেই ইতিহাসের আড়ালে থেকে যান কিছু নীরব মানুষ,যাদের উপস্থিতি ছাড়া অনেক ঘটনাই অসম্পূর্ণ থেকে যেত।সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জীবনে তেমনই এক ছায়াসঙ্গীর নাম ফাতেমা বেগম।

দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে গৃহকর্মীর পরিচয়ের বাইরে গিয়ে ফাতেমা বেগম খালেদা জিয়ার একান্ত সঙ্গী হিসেবে পাশে ছিলেন।কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ,গৃহবন্দিত্বের দীর্ঘ সময়,হাসপাতালের নিঃসঙ্গ রাত কিংবা বিদেশ সফরের নীরব মুহূর্ত—সবখানেই নীরবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
ফাতেমা বেগম কোনো রাজনৈতিক কর্মী নন,নেই কোনো দলীয় পদ।তবু রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কঠিন সময়ে তার উপস্থিতি ছিল অবিচ্ছেদ্য।
দুঃখে গড়া জীবনসংগ্রাম
ফাতেমা বেগমের জন্ম ভোলা সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের শাহ-মাদার গ্রামে।পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়।অল্প বয়সেই সংসারের দায়িত্ব নিতে হয় তাকে।
একই ইউনিয়নের কৃষক মো. হারুন লাহাড়ির সঙ্গে বিয়ের পর মেঘনা নদীর চরে কৃষিকাজ করে চলছিল সংসার।তাদের সংসারে জন্ম নেয় মেয়ে জাকিয়া ইসলাম রিয়া ও ছেলে মো. রিফাত।তবে ২০০৮ সালে,ছেলের বয়স মাত্র দুই বছর থাকাকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান তার স্বামী।এতে এক মুহূর্তেই বদলে যায় তার জীবন।
স্বামীর মৃত্যুর পর দুই সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে যান ফাতেমা।বাবার মুদি দোকানের সামান্য আয়ে সংসার চলা কঠিন হয়ে পড়ে।তখন সন্তানদের গ্রামে রেখে কাজের সন্ধানে ঢাকায় যাওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
খালেদা জিয়ার বাসভবনে কাজের শুরু
২০০৯ সালে এক পরিচিতজনের মাধ্যমে তিনি খালেদা জিয়ার বাসভবনে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন।সময়ের সঙ্গে দায়িত্বের পাশাপাশি গড়ে ওঠে বিশ্বাস ও মানবিক সম্পর্ক। ওষুধ খাওয়ানো,শারীরিক দুর্বলতায় সহায়তা করা এবং দৈনন্দিন দেখভালের দায়িত্ব পালন করতেন তিনি।
রাজনৈতিক উত্তাপের মাঝেও মানবিক দৃশ্য
২০১৪ সালের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচির সময় গুলশানের বাসভবনের সামনে বালুভর্তি ট্রাক দিয়ে পথরোধ করা হলে খালেদা জিয়া সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।সে সময় শারীরিকভাবে দুর্বল খালেদা জিয়ার হাত শক্ত করে ধরে পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় ফাতেমা বেগমকে।সেই দৃশ্য ক্যামেরার ফ্রেমে ধরা পড়ে এবং আলোচনায় আসে।
কারাগারেও সঙ্গী
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি আদালতের রায়ে খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে তার আইনজীবীরা গৃহকর্মী ফাতেমা বেগমকে সঙ্গে রাখার আবেদন করেন।আদালতের অনুমতিতে ছয় দিন পর তিনি কারাগারে প্রবেশ করেন।রাজনৈতিক কোনো পরিচয় ছাড়াই তিনি স্বেচ্ছায় কারাবন্দি জীবনযাপন করেন খালেদা জিয়ার সেবার জন্য।
করোনা ও হাসপাতালের দিনগুলো
২০২১ সালের এপ্রিল মাসে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৫৩ দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন খালেদা জিয়া।ওই সময় যখন অনেকেই সংক্রমণের ভয়ে দূরে ছিলেন,তখন ফাতেমা বেগম নিয়মিতভাবে তার পাশে থেকে সেবাদান চালিয়ে যান।
সর্বশেষ লন্ডনে উন্নত চিকিৎসার সময়ও খালেদা জিয়ার সঙ্গে ছিলেন ফাতেমা বেগম।
নীরবতার শক্তি
ফাতেমা বেগম প্রমাণ করেছেন,রাজনীতির বাইরে থেকেও মানবিক দায়িত্ববোধ দিয়ে ইতিহাসের অংশ হওয়া যায়। আলোচনার বাইরে থেকেও তার ভূমিকা রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নীরব সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।











